
দেশের চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণতন্ত্র মঞ্চ এবং এবি পার্টিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো একই অবস্থানে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান।
সোমবার (১৪ জুলাই) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় যেভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের মানুষ একত্রিত হয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও আওয়ামী লীগ ইস্যুতে সেই ঐক্যের ভিত্তি এখনো অটুট রয়েছে।
তিনি লিখেছেন, “জুলাইতে আমরা সবাই এক ছিলাম। পরবর্তী রাজনৈতিক পোলারাইজেশনে (মেরুকরণ) আমরা কেউ সরকারপক্ষ, কেউ বিরোধী পক্ষ। কিন্তু আওয়ামী দুঃশাসন প্রশ্নে আমরা সবাই আবার এক পক্ষ। আওয়ামী লীগ ইস্যু আসলে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণতন্ত্র মঞ্চ—আমরা সবাই ভাই ভাই। সবার রক্তের গ্রুপ এক ও একাকার।”
সংস্কার ও জুলাই সনদে বিএনপির সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেন
ফেসবুক পোস্টে মজিবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ বাদ দিলে রাষ্ট্র সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে এবি পার্টির সুস্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, এসব বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের অবস্থান কাছাকাছি হলেও, জুলাই সনদের প্রশ্নটি না থাকলে জামায়াতের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোট বা বন্ধুত্বের প্রয়োজন হতো না।
তিনি লেখেন, “আমাদের যার যার মত, পথ ও রাজনীতি তার তার।”
জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য
মজিবুর রহমান তাঁর স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, সংস্কার ইস্যুতে মতবিরোধের জেরে তাঁকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করার পর দলটির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক পথ আলাদা হয়ে যায়।
তিনি দাবি করেন, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পর জামায়াতের একটি অংশের নেতা-কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এবি পার্টির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে এবং তাঁদের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় জবাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, একসময় জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল “চরম বিরোধপূর্ণ”।
বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনের সম্পর্কের কথাও স্মরণ
এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁরা বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে না থাকলেও রাজপথে দুই দলের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সখ্য তৈরি হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, বিএনপির শীর্ষ নেতারা তাঁদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও জামায়াতের অনেক নেতা আমন্ত্রণ পেয়েও উপস্থিত হননি।
তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিএনপি, জামায়াত এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি রাজপথ, রিমান্ড, কারাগার ও হাসপাতালে একই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, “জুলাই সব মত ও পথকে একত্র করেছিল। সবাই বিরোধ ও দূরত্ব ভুলে গিয়েছিল।”
৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক মেরুকরণের কথা
মজিবুর রহমানের মতে, ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয়। তখন রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদের প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য তৈরি হয়।
তিনি বলেন, সেই সময়ে এবি পার্টি, এনসিপি ও গণতন্ত্র মঞ্চ চেষ্টা করেছিল জুলাই সনদের বিষয়ে সব পক্ষকে ঐকমত্যে রাখতে।
তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে জামায়াতের অবস্থান আন্তরিক হলেও বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট ছিল না। এর ফলে গণভোট, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত)–এর মতো বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়।
নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব পড়ার দাবি
স্ট্যাটাসে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, এসব মতপার্থক্যের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়ে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত জোট এবং জামায়াত-প্রভাবিত ১১-দলীয় জোট আলাদা পথে চলে যায়। সে সময় এবি পার্টি ও এনসিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয় এবং বিএনপি তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়।
‘আওয়ামী লীগ ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধতাই মূল বার্তা’
ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়ে জানতে চাইলে সোমবার বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে মজিবুর রহমান বলেন, এটি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের বিষয়টিই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন।
তাঁর ভাষায়, “কোনো বিশেষ কারণে এই স্ট্যাটাস না। এটা মূলত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধতা ইস্যুতে লেখা। আমাদের যত বিরোধই থাকুক, আওয়ামী লীগ ইস্যুতে সবাই ঐক্যবদ্ধ—এটাই মূল বার্তা।”
‘অভ্যুত্থানের শক্তিকে অন্তত পাঁচ বছর ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে’
এদিন দুপুরে দেওয়া আরেকটি পৃথক ফেসবুক স্ট্যাটাসেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান।
সেখানে তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষের উচিত কৌশলগতভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনগত প্রক্রিয়ার আওতায় আনা।
তিনি বলেন, এরপর আইনগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক—সব দিক থেকেই তাঁদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মজিবুর রহমানের দাবি, বর্তমানে সংসদ কার্যকর থাকায় এ দায়িত্ব সরকার ও বিরোধী দলের ওপর বর্তায়। তবে এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা না হলে ভবিষ্যতে বিচারের ভার জনগণের হাতে চলে যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতে বিএনপি, জামায়াত এবং জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির অন্তত পাঁচ বছর ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।
তিনি তাঁর স্ট্যাটাসে আরও উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা ও আত্মসমর্পণ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটি রাজনৈতিক ঐক্য আরও জোরদার করার একটি সুযোগ হতে পারে এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।