
হরমুজ প্রণালিতে ওমানের জলসীমার কাছে জ্বালানি তেলবাহী দুটি ট্যাংকারে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। পরে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পৃথক বিবৃতিতে হামলার দায় স্বীকার করে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি আবারও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দুটি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘মোম্বাসা’ এবং ‘আল বাহিয়াহ’ নামের দুটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ছোড়া দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
হামলার সময় ট্যাংকার দুটি ওমানের জলসীমার ভেতরে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে চলাচল করছিল।
মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক, যিনি ট্যাংকারের ক্রু হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, নিহত হন। আহত হন আরও আটজন। তাঁদের মধ্যে চারজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন অধ্যায়
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা শুরু করার পর তার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এর আগেও ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলেছিল। সর্বশেষ এই হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
হামলার দায় স্বীকার আইআরজিসির
আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরান হামলার বিষয়টি অস্বীকার না করে বরং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিবৃতির বরাতে দেশটির আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দুটি সুপারট্যাংকারকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আমিরাতের পক্ষ থেকে হতাহতের তথ্য প্রকাশের পরপরই আইআরজিসির বিবৃতি প্রচার করা হয়।
ইরানের দাবি: সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল ট্যাংকার দুটি
আইআরজিসির বরাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখে ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহার করছিল।
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্যাংকার দুটিকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে যাত্রা অব্যাহত রাখে।
এরপর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজ দুটি অচল হয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।
তবে এই দাবির স্বাধীন বা নিরপেক্ষ কোনো যাচাই এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বাহরাইনেও হামলার দাবি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়
এদিকে বাহরাইনের বাদশাহর গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা নাবেল আলহাম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের হামলা শনাক্ত করে সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, বাহরাইনের আলজুফেয়ার সামরিক ঘাঁটিতে থাকা অস্ত্রের মজুতাগার, একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্র এবং মার্কিন সেনাদের আবাসিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
কুয়েতে মার্কিন স্থাপনাতেও হামলার দাবি
ইরানের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং ‘মার্কিন শত্রুদের একটি যান’ লক্ষ্য করেও সফল হামলা চালানো হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা কুয়েতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সর্বশেষ রাতে দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর প্রদেশের জাম, বুশেহর ও কানগান এলাকায় হামলা হয়েছে।
এ ছাড়া বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশের অমিদিয়েহ শহরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির দ্বীপগুলোতেও হামলা
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কেশম, আবু মুসা এবং কিশ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের কোনারাক ও চাবাহার এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই নৌপথে সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।