
বর্তমান সরকার কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না বলে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, উগ্রবাদ ও সহিংস মতাদর্শ মোকাবিলায় সরকার বিরোধী দলের পূর্ণ সহযোগিতা পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশে আর কখনো যেন ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং বাংলাদেশ কোনোভাবেই একটি ‘তাঁবেদারি রাষ্ট্রে’ পরিণত না হয়—সে জন্য জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গত ৭ জুন শুরু হওয়া অধিবেশন বুধবার শেষ হয়।
২৬ কার্যদিবসের অধিবেশন, পাস হয়েছে ১০টি বিল
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় অধিবেশনে মোট ২৬টি কার্যদিবস ছিল। ৩০ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পাস হয়। এ অধিবেশনে মোট ১০টি বিল পাস হয়েছে এবং সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ ১১টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে, যার মধ্যে ৩৫টির উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উদ্দেশে জমা দেওয়া ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্নের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টির উত্তর দেওয়া হয়েছে।
উগ্রবাদ দমনে সরকার-বিরোধী দলের ঐক্যের আহ্বান
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থাকে প্রশ্রয় দেবে না। সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, উগ্রবাদ প্রতিরোধের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকবে বলে তিনি আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদের স্থান থাকবে না। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারও কেউ হরণ করতে পারবে না।
‘মতভিন্নতা থাকবে, শত্রুতা নয়’
সংসদীয় গণতন্ত্রের সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান বলেন, সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। তবে সেই মতভিন্নতা কখনো শত্রুতা বা প্রতিহিংসায় রূপ নেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
ফ্যাসিবাদ ও ‘তাঁবেদারি রাষ্ট্র’ ঠেকাতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আর কখনো যেন ফ্যাসিবাদ, স্বৈরতন্ত্র কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসন ফিরে আসতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, যাতে বাংলাদেশ কোনো বিদেশি শক্তির প্রভাবাধীন বা ‘তাঁবেদারি রাষ্ট্রে’ পরিণত না হয়।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
বক্তব্যে জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফা এখন দেশের মানুষের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে। একইভাবে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং এর প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনা
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে উন্নয়নের অনেক প্রচার হলেও বাস্তবে জনগণ তার সুফল পায়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী বিপুল অর্থের মালিক হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবও অর্থনীতিতে পড়েছে। তবে সরকার ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নিচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। উৎপাদন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি হবে সরকারের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, বর্তমান পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে সরকার আশা করছে।
দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান
দুর্নীতিকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের স্বৈরশাসনের সময়ে প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কোনো আপস করবে না। প্রয়োজন হলে কঠোরতম উপায়ে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অতীতের সরকার একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে জনগণকেন্দ্রিক একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিতভাবে পাবেন।
‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা
সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সেবাকে একীভূত করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব সেবা জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দয়া নয়; বরং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণা
শিক্ষা খাতের উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এবং নকল ও অটোপাসের সংস্কৃতি চালু করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘জনগণের সংসদ’ গড়ে উঠেছে
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংসদ জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রাণবন্ত বিতর্ক, মতবিনিময় ও গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে সংসদ আরও কার্যকর হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে এবং জনগণের জীবন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষা করাকে সরকারের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন।