
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটে পাওয়া জনসমর্থনের প্রতি অনীহা দেখিয়ে সেই চেতনা থেকে সরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, সরকার যদি সত্যিই জুলাইয়ের চেতনায় বিশ্বাস করে, তাহলে গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ১১–দলীয় ঐক্য জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, গণভোটে পাওয়া গণরায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার বিচার দাবিতে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে এই সমাবেশ ও পরবর্তী র্যালির আয়োজন করা হয়।
বিএনপির বিরুদ্ধে জুলাইয়ের চেতনা থেকে সরে যাওয়ার অভিযোগ
সমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ এবং বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, “বিএনপির সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টে এবং টকশোতে জুলাইয়ের চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এমনকি তাঁরা আওয়ামী লীগের খুনিদের প্রশ্রয় দিয়ে তাঁদের এ দেশে অনুপ্রবেশের পক্ষে সহানুভূতি দেখাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি প্রকৃত অর্থেই জুলাইয়ের আদর্শ ও গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে, তাহলে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে’
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং ৮৪টি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন এড়াতেই বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে নিজেদের ভিন্নমতকে সামনে আনছে।
তিনি বলেন, বিএনপি সংসদে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দিলেও মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে দলটি কার্যকর অবস্থান নেয়নি।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের বেতন–ভাতা নিয়েও প্রশ্ন
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ফাউন্ডেশনের কর্মচারীরা পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সুফলভোগী বিএনপি। এই আন্দোলন না হলে তারা কি সরকার গঠন করতে পারত? এমপি-মন্ত্রীদের বেতন তো নিয়মিত হচ্ছে, তাহলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মচারীদের বেতন কেন বাকি থাকবে?”
একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিরা কেন চিকিৎসা ব্যয় পাচ্ছেন না এবং তাঁদের ভাতা কেন বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যার তুলনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে দাবি করে সরকারকে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল শহীদ তালিকা প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।
‘এক জালিম গেছে, আরেক জালিম এসেছে’
সমাবেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র ও সহসভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও দেশে এখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তিনি বলেন, “বাস্তবতা হলো এক জালিম বিদায় নিয়েছে, আরেক জালিম মসনদে এসে বসেছে।”
বিএনপির উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় এসে কেউ যদি মনে করেন নতুন করে দিল্লির গোলামি করবেন এবং শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন, তাহলে জনগণ সেই সরকারকেও টিকতে দেবে না।
শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, সরকারের কাছে থাকা জুলাই শহীদদের তালিকা এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।
তিনি দাবি করেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি শহীদের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের শর্ত পূরণ করতে না পারায় সরকার এখন পর্যন্ত ৮৫০ জনের কিছু বেশি শহীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছে।
তাঁর মতে, প্রকৃত শহীদদের পরিচয় নিরূপণ এবং তাঁদের পরিবারকে যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সমাবেশ শেষে র্যালি
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শাহবাগ মোড় অতিক্রম করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
১১–দলীয় ঐক্য জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান জাফরুল্লাহ চৌধুরী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজীসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা।
সমাবেশে বক্তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন দ্রুত আহ্বান, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।