
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিকল্পিতভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এ অঞ্চলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হওয়ায় কুড়িগ্রাম ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এতে এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য উন্নয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার টগরাইহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত কৃষক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ সমাবেশের আয়োজন করে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নাহিদ ইসলাম সমাবেশস্থলে পৌঁছালে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা তাঁকে স্বাগত জানান। এর আগে দুপুর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে এনসিপি, জাতীয় কৃষক শক্তি এবং দলটির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হন।
‘উত্তরাঞ্চলকে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে’
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণে এ অঞ্চলের উন্নয়ন বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “তিস্তা পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেও কোনো অর্জন নিয়ে ফিরতে পারেননি। উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ এমপি বিরোধী দলের হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে এ অঞ্চলের উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও রংপুরে বড় কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। এভাবে উত্তরাঞ্চলের মানুষকে তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।”
তাঁর মতে, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে হলে উত্তরাঞ্চলের জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং অবকাঠামো, কৃষি ও নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
‘জুলাই আন্দোলনে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য’
গণ-অভ্যুত্থানে উত্তরাঞ্চলের মানুষের অবদানের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই অঞ্চলের মানুষ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং অনেকেই জীবন উৎসর্গ করেছেন।
তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে উত্তরাঞ্চলের মানুষ জীবন দিয়েছেন। রংপুরের সন্তান আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে প্রাণ দিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের মানুষ ভোট দিয়ে এগারো দলকে বিজয়ী করেছেন। আমরা এই অঞ্চলের মানুষের ভোটের অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ।”
তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা এবং উন্নয়নের সুফল দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যের দাবি
কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, কুড়িগ্রামের আলুচাষিরা প্রায়ই উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য পান না। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক সময় বাধ্য হয়ে কৃষকদের কম দামে আলু বিক্রি করতে হয়, এমনকি ফেলে দিতেও হয়।
তিনি বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসারের পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সরকারি ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকেরা স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তাঁর দাবি, বর্তমানে সরকার প্রতি মণ ধানের ক্রয়মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও কৃষকদের বাধ্য হয়ে ১ হাজার ১৪০ টাকায় ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, “প্রতি উপজেলায় এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।” তিনি এ বিষয়ে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অন্য বক্তাদের বক্তব্য
সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি কৃষি, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন কৃষক সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল, সদস্যসচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম, এনসিপির কুড়িগ্রাম জেলা আহ্বায়ক মুকুল মিয়া, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তির আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম, নারী শক্তির আহ্বায়ক নাসিরা খন্দকার, মেরিনা আক্তার এবং কুড়িগ্রাম-২ (সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ।
সমাবেশে জুলাই আন্দোলনে শহীদ কুড়িগ্রামের রাজীব হাসানের মা জান্নাতুল ফেরদৌসও বক্তব্য দেন। তিনি আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
ব্যাপক উপস্থিতি
বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে এনসিপি, জাতীয় কৃষক শক্তি এবং দলটির বিভিন্ন সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী, কৃষক এবং সমর্থকেরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। এতে টগরাইহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সমাবেশে বক্তারা কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো সম্প্রসারণ, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করা এবং গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।