
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ (Duration of Status) ব্যবস্থা বাতিল করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর নির্ধারণ করা হবে। শিক্ষা ও অভিবাসনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) এবং দীর্ঘমেয়াদি পিএইচডি প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ওপর।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এফ-১ (F-1) শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে নিবন্ধিত থাকা এবং ভিসার শর্ত মেনে চলা পর্যন্ত দেশটিতে অবস্থান করতে পারেন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের পরিবর্তে তাঁদের অবস্থান নির্ভর করে শিক্ষার্থী হিসেবে বৈধ স্ট্যাটাস বজায় রাখার ওপর। তবে নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সেই ব্যবস্থা আর থাকবে না। এর পরিবর্তে ভিসার মেয়াদ চার বছরে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং এই সময় শেষ হওয়ার আগে বা পরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান অব্যাহত রাখতে চাইলে নতুন করে মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে এমন শিক্ষার্থীদের জন্য, যাঁদের ডিগ্রি সম্পন্ন করতে চার বছরের বেশি সময় লাগে। বিশেষ করে এসটিইএম বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স, ডক্টরাল (পিএইচডি) বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক প্রোগ্রাম সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে চলে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ ডিগ্রি শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
সে ক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলে নতুন করে ভিসা বা অবস্থানের অনুমতি নবায়নের আবেদন করতে হবে। কিন্তু সেই আবেদন অনুমোদিত হবে কি না, কত সময় লাগবে কিংবা প্রক্রিয়াটি কতটা জটিল হবে—এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। ফলে গবেষণা, ল্যাবভিত্তিক কাজ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক প্রকল্পে নিয়োজিত শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত চাপ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নিয়ম শুধু বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নয়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা গবেষণানির্ভর বা দীর্ঘমেয়াদি এসটিইএম প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা এখন বিকল্প গন্তব্য হিসেবে কানাডা, জার্মানি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। এসব দেশে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং পরবর্তী কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে নীতিগত স্থিতিশীলতা বেশি থাকায় শিক্ষার্থীরা সেদিকে ঝুঁকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু উচ্চশিক্ষাই নয়, এই পরিবর্তনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান বাজারেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক এসটিইএম স্নাতক যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ভিসা নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগে আরও সতর্ক হতে পারে।
বিশেষ করে বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখলেও ছোট প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং স্টার্টআপগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে দক্ষ মানবসম্পদ নিয়োগে বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এমএসএম ইউনিফাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সঞ্জয় লাউল বলেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন পিএইচডি ও গবেষণামুখী শিক্ষার্থীরা। তাঁর ভাষ্য, যদি ভিসা নবায়নের প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে বা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এমন অনেক আন্তর্জাতিক মেধাবী শিক্ষার্থীকে হারাতে পারে, যাঁদের আকৃষ্ট করতে বর্তমানে কানাডা, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য। তবে ভিসা ব্যবস্থায় এই ধরনের পরিবর্তন কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যা দেশটির উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ দক্ষ জনশক্তি অর্জনের সক্ষমতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।