
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। টানা নবম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। একই সময়ে ইরানও পাল্টা সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। কুয়েতের আকাশসীমায় ড্রোন প্রতিহত করার দাবি, সিরিয়ায় ‘শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে’ হামলার ঘোষণা এবং বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতাসূচক সাইরেন—সব মিলিয়ে সোমবার ভোরে আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
বিশ্লেষকদের মতে, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান এই সংঘাত এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশ সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
টানা নবম রাতের হামলার ঘোষণা সেন্টকমের
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) রোববার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে জানায়, তারা টানা নবম রাতের মতো ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফার সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
সেন্টকমের দাবি, এই হামলার মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালাতে ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।
মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক রাখাই এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। এর জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদেশ এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে দেওয়ার সক্ষমতাও প্রদর্শন করে তেহরান।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি পাঁচ ব্যারেলের একটি এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে প্রণালিটিকে ঘিরে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
কুয়েতে ড্রোন প্রতিহত করার দাবি
সোমবার ভোরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, ইরানের আগ্রাসনের পর তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
সামরিক বাহিনীর সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েকটি ড্রোন তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করলে সেগুলো সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জনগণকে উদ্দেশ করে আরও জানায়, কোথাও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই; সেগুলো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রমের অংশ হতে পারে।
সিরিয়ায় ‘শত্রু নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে’ হামলার দাবি আইআরজিসির
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা সিরিয়ার আল-তানফ এলাকায় শত্রুপক্ষের একটি বিশেষ অভিযান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে আকস্মিক হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহত ইরানি সেনাদের রক্তের প্রতিশোধ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
টেলিগ্রামে প্রকাশিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, সিরিয়ার আল-তানফ অঞ্চলে অবস্থিত শত্রুপক্ষের বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী কমান্ড সেন্টারকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে এই হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি তেহরানের
ইরান রোববার দাবি করেছে, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় একটি নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি পরিবহন ও অবকাঠামোগত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কুয়েতের পক্ষ থেকে এই দাবির সত্যতা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বাহরাইনে সাইরেন, জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সম্ভাব্য বিমান হামলার আশঙ্কায় দেশটিতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে।
সরকার নাগরিক ও বিদেশি বাসিন্দাদের নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে জর্ডান জানিয়েছে, রোববার তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের টানা বিমান হামলা এবং ইরানের ধারাবাহিক পাল্টা অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র এবং সিরিয়াসহ একাধিক দেশের সম্পৃক্ততা এই সংকটকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান এই উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।