
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত আরও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। টানা অষ্টম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। সর্বশেষ হামলায় ইরানের দারখোভিন অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চল ও ইরাক সীমান্তসংলগ্ন কয়েকটি এলাকাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী ও ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে ইরান। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক স্থগিত করার ঘোষণা দিয়ে তেহরান আরও ‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা
মার্কিন বাহিনীর সর্বশেষ অভিযানে ইরানের দারখোভিন এলাকায় নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র আক্রান্ত হয়।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও এর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করতে সংস্থাটি তদন্ত শুরু করেছে।
অন্যদিকে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা এক বিবৃতিতে এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সংস্থাটি বলেছে, শান্তিপূর্ণ পরমাণু অবকাঠামোতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং যুক্তরাষ্ট্র আবারও আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে।
কেন হামলা চালানোর দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার রাতের অভিযানের লক্ষ্য ছিল—
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা,
জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার জন্য ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) জবাব দেওয়া।
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক শহরের কাছাকাছি এবং ইরাক সীমান্তবর্তী শাদেগান এলাকার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
সমঝোতা স্মারক স্থগিত করল ইরান
নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ওই সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে। ফলে সেই চুক্তি কার্যকর রাখার কোনো সুযোগ নেই।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেখানে হামলা বন্ধ রাখা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তত্ত্বাবধানে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে উভয় পক্ষই পরে সেই শর্তগুলো পুরোপুরি অনুসরণ করেনি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন বিরোধ
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি।
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা অনুযায়ী নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার না করে জর্ডানের উপকূলঘেঁষা বিকল্প রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করছে।
তেহরানের দাবি, এ কারণেই নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
রোববারও ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজে কয়েকটি জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
তাদের ভাষ্যমতে, চারটি জাহাজ ‘অনিরাপদ’ রুট ব্যবহার করছিল। সতর্কবার্তা দেওয়ার পর দুটি জাহাজ ফিরে গেলেও বাকি দুটি ‘দুর্ঘটনার’ শিকার হয়েছে।
তবে ওই জাহাজগুলো হামলার শিকার হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখাই ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য।
ইরান সমঝোতা স্মারক স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যম নিউজনেশনকে ট্রাম্প বলেন,
“এতে আমার কিছু যায় আসে না।”
তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের পরিবর্তে সামরিক চাপ বজায় রাখার কৌশলেই অটল রয়েছে ওয়াশিংটন।
কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েতে অবস্থিত আল আদিরি ক্যাম্প এবং আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।
এদিকে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের একটি পানি পরিশোধনাগার হামলার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে জর্ডান জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা কয়েকটি ইরানি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে ইরানের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সামরিক অভিযানের জবাব ভবিষ্যতে আরও ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশবাসীর প্রতি জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিদেশি হামলার মুখে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জাতীয় সংহতি এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ইসরায়েলের প্রস্তুতি
সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও জ্বালানি সরবরাহকারী সামরিক উড়োজাহাজ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলও ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল। পরে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েল সরাসরি হামলা বন্ধ রাখে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইলে হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারেন। তবে সামরিক পদক্ষেপ তখনই কার্যকর হয়, যখন তা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, লাগাতার মার্কিন হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটির জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও প্রতিরোধের মানসিকতা আরও জোরদার করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি পরমাণু স্থাপনায় হামলার মতো স্পর্শকাতর পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিও নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।