
সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত গ্রহণ, রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার, আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ, রাষ্ট্র সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের শেষে শরিক দলগুলোর নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী।
সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠককে সরকার ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারে সীমিতসংখ্যক শরিক দলের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করায় জোটের কয়েকটি দলের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত এই বৈঠক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সরকার পরিচালনায় সমন্বয়ের বার্তা
বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে শরিক দলগুলোর মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোটকে আরও কার্যকর ও সুসংহত করার লক্ষ্যেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে একাধিক অগ্রাধিকারমূলক কাজ সামলাতে হয়েছে। সে কারণে শরিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের মতবিনিময় নিয়মিত হবে এবং সরকার পরিচালনায় শরিকদের পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, সরকার জনগণের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কৃষিঋণ, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় নেতা ও ক্রীড়াবিদদের ভাতা এবং খাল পুনঃখননের মতো বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার একটি ‘ধ্বংসস্তূপ’ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভেঙে পড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
শরিকদের পক্ষ থেকে সমন্বয় বাড়ানোর দাবি
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা সরকার পরিচালনায় শরিক দলগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, সরকার গঠনের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরিকদের মতামত প্রতিফলিত হয়নি।
আলোচনায় কয়েকজন নেতা বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচন, স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে শরিকদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। এতে বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে, যা জোটের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া গত পাঁচ মাসে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন শরিক নেতা। তাঁদের মতে, যুগপৎ আন্দোলনের সময় যেসব রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।
বৈঠকে একজন শরিক নেতা আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বৈঠকের আমন্ত্রণ প্রথমে মুখ্য সচিবের কার্যালয় থেকে পাঠানো হলেও পরে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত ও রাজনৈতিকভাবে উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল।
যাঁরা উপস্থিত ছিলেন
বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শরিক দলগুলোর মধ্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, রফিকুল ইসলাম বাবলু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফরিদুজ্জামান ফরহাদসহ বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন।
এ ছাড়া নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের আগে তাঁকে প্রার্থী না করাকে কেন্দ্র করে কিছুটা রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হলেও সাম্প্রতিক এই বৈঠকে তাঁর অংশগ্রহণকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেএসডি ও জমিয়তের অনুপস্থিতি
তবে বৈঠকে অংশ নেয়নি আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। দলটির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ জানান, বৈঠকে না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে লিখিতভাবে তাদের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
চিঠিতে জেএসডি উল্লেখ করেছে, জুলাই সনদ, গণভোট এবং রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করলে দলের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তবে রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্যোগে সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ হলে তারা গঠনমূলকভাবে অংশ নেবে।
অন্যদিকে, যুগপৎ আন্দোলনের অংশ না হলেও নির্বাচনী সমঝোতার কারণে আমন্ত্রিত হয়েছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। তবে দলটিও বৈঠকে অংশ নেয়নি। দলের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, বৈঠকের আমন্ত্রণ পেলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁরা এতে অংশ নেননি। তবে অনুপস্থিতির কারণ আপাতত প্রকাশ করতে চাননি।
নির্বাচনের পর শরিকদের অবস্থান
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিক দলগুলোর জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে নিজস্ব প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা পাঁচটি দলের জন্য ছিল আটটি আসন।
নির্বাচনে জয়ী হন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ। পরে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক এবং ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আন্দালিভ রহমান পার্থকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়।
এ ছাড়া কয়েকজন শরিক নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খাঁনকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে হাস্যরসের মুহূর্ত
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি বৈঠকের শেষ দিকে কিছুটা হালকা পরিবেশও তৈরি হয়। উপস্থিত এক নেতা রসিকতার ছলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, এই নৈশভোজ কি ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’? জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাসতে হাসতে বলেন, “না, এটি ওয়েলকাম ডিনার।” এতে বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
মির্জা ফখরুলের প্রতিক্রিয়া
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর অনুষ্ঠিত এই বৈঠক রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছরের আন্দোলন, কারাবরণ, মামলা, গুম এবং হত্যার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বৈঠকে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শরিক দলগুলোর নেতারা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান আইন অনুযায়ী দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাঁদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেন। এ বৈঠকের মাধ্যমে সরকার ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের নতুন পর্ব শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।