
সেনা আইনে বিচারের ঘোষণা, সিভিল আইনে মামলা নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নয়; সীমান্ত নিরাপত্তা, মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও ‘পুশ ইন’ ইস্যুতেও সরকারের অবস্থান তুলে ধরলেন সালাহউদ্দিন আহমদ
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের বিচার সেনা আইনে জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, একই মামলার অন্যান্য অভিযুক্তদের বিচার যেহেতু সামরিক আদালতে হয়েছে, তাই মোজাফফর হোসেনের ক্ষেত্রেও সেনা আইনের আওতায় বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের শহীদ ক্যাপ্টেন আশরাফ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন এবং সীমান্ত নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন।
‘জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমেই বিচার নিশ্চিত করা হবে’
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর তিনি ভিন্ন পরিচয়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে আত্মগোপনে ছিলেন।
তিনি বলেন, “মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর অন্য সহযোগীদের বিচার তখন সামরিক আদালতে হয়েছে। সেখানে কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ভিন্ন পরিচয়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে পলাতক ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সেনা আইনে বিচার করার জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে তাঁর বিচার নিশ্চিত করা হবে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় যাঁরা আগে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদের রায়ে মোজাফফর হোসেনকে নিয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ বা নির্দেশনা থাকলে সেটিও জেনারেল কোর্ট মার্শাল বিবেচনায় নেবে।
‘একই অপরাধে দুই আইনে বিচার সম্ভব নয়’
মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে সিভিল আইনে পৃথক মামলা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি এখনই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, একই ব্যক্তিকে একই অপরাধে দুই ভিন্ন আইনের আওতায় বিচার করা আইনগতভাবে সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে আইনগত দিকগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার
গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
পরদিন তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম পলাতক আসামি হিসেবে প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন।
মিয়ানমার সীমান্তে ১০৯ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়ার প্রস্তাব
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে দেশটির সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি, আরএসও, আরসাসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ হচ্ছে। এসব সংঘাতের প্রভাব অনেক সময় বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়ও পড়ছে।
তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান বেড়েছে এবং গোলাগুলির ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এসব বিষয় বিবেচনায় সরকার ১০৯ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ভূমিমাইন শনাক্তে বিজিবিকে যন্ত্রপাতি
মিয়ানমার সীমান্তে ভূমিমাইনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কেও তথ্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ভূমিমাইন শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে বিজিবিকে সরবরাহ করা হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা সেগুলো ব্যবহার করছেন, যাতে সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো যায়।
‘অবৈধ পুশ ইন সফলভাবে ঠেকানো হয়েছে’
ভারত থেকে বাংলাদেশে কথিত ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক লোক পাঠানোর বিষয়ে সরকারের অবস্থানও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, সরকার কাউকেই অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি।
মন্ত্রী বলেন, “বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার জনগণের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত অবৈধ পুশ ইন সফলভাবে ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। কিছু অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে, তবে সংখ্যা খুবই সীমিত। তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাউকে পুশ ইন করতে দেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক কারণে বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভারতে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি দাবি করা হলে প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁদের তালিকা পাঠাতে হবে। এরপর বাংলাদেশ সরকার নাগরিকত্ব যাচাই করবে। যাচাইয়ে সত্যতা মিললে আইনগত প্রক্রিয়ায় তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এর বাইরে কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
বিজিবিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ
সংবাদ সম্মেলনে বিজিবিকে আরও সক্ষম করে তোলার জন্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রণীত আধুনিক মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড গড়ে তুলতে সময় লাগবে। তাই আপাতত বিজিবির বিদ্যমান ডগ স্কোয়াডকে মাদকবিরোধী অভিযানে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে।
এ ছাড়া বিজিবির জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যানবাহন, প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম ও অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ‘এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রমও আরও সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যাতে জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিজিবির সক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়।