
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অ্যাপোলো–১১ অভিযানে নীল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রাখেন। তাঁর কয়েক মিনিট পর যোগ দেন বাজ অলড্রিন। পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিল।
তবে ইতিহাসে এটি যতটা নিখুঁত সাফল্যের গল্প হিসেবে পরিচিত, বাস্তবে মিশনটি ছিল একের পর এক সংকট, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং অজানা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক রুদ্ধশ্বাস অভিযান।
চাঁদে নামার সময় কম্পিউটারের রহস্যময় অ্যালার্ম, মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জ্বালানি হাতে অবতরণ, হোয়াইট হাউসে নভোচারীদের মৃত্যু ধরে প্রস্তুত রাখা ভাষণ, চাঁদের বুকে প্রথম ধর্মীয় আচার, একটি ভাঙা সুইচ মেরামতে সাধারণ ফেল্ট-টিপ কলমের ব্যবহার, পৃথিবীতে ফিরে ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন এবং চাঁদের পাথর নিয়ে পরবর্তী বিভ্রান্তি—এসব তথ্যের অনেকগুলোই জনসমক্ষে আসে বহু বছর পরে।
অবতরণের শেষ মুহূর্ত: যখন সবকিছু ঝুলে ছিল কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্তে
চাঁদে অবতরণের একেবারে শেষ পর্যায়ে লুনার মডিউল ‘ইগল’ দ্রুত নিচে নামছিল। ঠিক তখনই অনবোর্ড গাইডেন্স কম্পিউটারে একের পর এক ভেসে ওঠে ‘১২০২’ ও ‘১২০১’ নামে পরিচিত সতর্ক সংকেত।
পরে নাসা জানায়, কম্পিউটারের ওপর তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কাজের চাপ পড়ে যাওয়ায় এই অ্যালার্ম দেখা দিয়েছিল।
সমস্যা হলো, তখন হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। অভিযান বাতিল করা হবে, নাকি চালিয়ে যাওয়া হবে—এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশনের ভবিষ্যৎ।
সৌভাগ্যক্রমে, আগের সিমুলেশন পরীক্ষায় একই ধরনের অ্যালার্ম দেখা গেলেও নিরাপদ অবতরণ সম্ভব হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই মিশন কন্ট্রোল অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, জ্বালানি মাত্র ৩০ সেকেন্ড
সমস্যা এখানেই শেষ হয়নি।
লুনার মডিউল আলাদা হওয়ার পর থেকেই পৃথিবীর সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। অনেক সময় সংকেত দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল, আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে যাচ্ছিল।
এদিকে আর্মস্ট্রং জানালা দিয়ে দেখতে পান, স্বয়ংক্রিয় অবতরণ ব্যবস্থা মহাকাশযানটিকে বড় বড় পাথর ও গর্তে ভরা বিপজ্জনক একটি স্থানে নামাতে যাচ্ছে।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে নিজেই হাতে নিয়ন্ত্রণ নেন।
হিউস্টন থেকে তখন বারবার জানানো হচ্ছিল—
"৬০ সেকেন্ড ফুয়েল"
এরপর "৩০ সেকেন্ড ফুয়েল"
এর বেশি সময় থাকলে নিয়ম অনুযায়ী অভিযান বাতিল করে আবার মহাকাশে ফিরে যেতে হতো। অন্যথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত বেশি।
শেষ পর্যন্ত সব শঙ্কা দূর করে আর্মস্ট্রং ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত বার্তা পাঠান—
"Houston, Tranquility Base here. The Eagle has landed."
এই ঘোষণা শোনার পর মিশন কন্ট্রোলের প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময়ের চাপা উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তি পান।
চাঁদে প্রথম ধর্মীয় আচার, যা নাসা তখন প্রকাশ করেনি
চাঁদে নামার পর বাইরে বের হওয়ার আগে বাজ অলড্রিন একটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচার পালন করেছিলেন।
তিনি নিজের সঙ্গে একটি ছোট কমিউনিয়ন কিট নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ছিল রুপার ছোট পাত্র, সামান্য পানীয় এবং রুটির টুকরা।
কিন্তু সেই ঘটনা নাসা তখন প্রকাশ করেনি।
এর কারণ ছিল একটি চলমান আদালত মামলা।
অ্যাপোলো–৮ অভিযানে মহাকাশ থেকে বাইবেলের অংশ পাঠ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে অলড্রিন ইচ্ছাকৃতভাবেই বিষয়টি জনসমক্ষে উল্লেখ করেননি।
চাঁদের মাটিতে নেমে চারপাশ দেখে তাঁর প্রথম মন্তব্য ছিল—
"Magnificent Desolation"
অর্থাৎ, "অপূর্ব শূন্যতা"।
যদি তাঁরা আর ফিরতে না পারতেন...
অ্যাপোলো–১১ সফল হলেও নাসা ও হোয়াইট হাউস সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিল অন্য একটি বিষয়।
চাঁদ থেকে ফেরার সময় যদি লুনার মডিউলের আরোহণ ইঞ্জিন চালু না হতো, তাহলে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনকে উদ্ধার করার কোনো উপায়ই ছিল না।
তখন কমান্ড মডিউলে থাকা মাইকেল কলিন্সকে একাই পৃথিবীতে ফিরে আসতে হতো।
এই আশঙ্কা থেকেই প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জন্য আগে থেকেই একটি শোকবার্তা লিখে রেখেছিলেন তাঁর ভাষণলেখক উইলিয়াম সাফায়ার।
সেখানে লেখা ছিল—
"নিয়তি হয়তো এটাই নির্ধারণ করে রেখেছে যে শান্তির সন্ধানে চাঁদে যাওয়া মানুষ দুজন চাঁদের বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত থাকবেন।"
সেই ভাষণ কখনো প্রচার করতে হয়নি।
প্রায় ৩০ বছর পর ন্যাশনাল আর্কাইভ থেকে এটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে।
একটি ভাঙা সুইচ, একটি সাধারণ কলম এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত
অ্যাপোলো–১১ মিশনের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল চাঁদ থেকে ফেরার ঠিক আগে।
চাঁদের মাটিতে কাজ শেষ করে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন যখন আবার লুনার মডিউলে উঠছিলেন, তখন তাঁদের ভারী লাইফ সাপোর্ট ব্যাকপ্যাকের ধাক্কায় ইঞ্জিন-আর্ম সার্কিট ব্রেকার সুইচ ভেঙে যায়।
এই সুইচটি ছাড়া আরোহণ ইঞ্জিন চালু করা সম্ভব ছিল না।
অর্থাৎ—
সুইচটি কাজ না করলে তাঁরা চাঁদেই আটকে পড়তেন।
হিউস্টনের প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও কোনো সমাধান বের করতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত বাজ অলড্রিন নিজের সঙ্গে থাকা একটি সাধারণ ফেল্ট-টিপ মার্কার কলম ব্যবহার করেন।
ধাতব বস্তু ব্যবহার করলে শর্টসার্কিট হতে পারত।
তাই তিনি প্লাস্টিকের কলমটির ডগা ভাঙা সুইচের জায়গায় ঢুকিয়ে চাপ দেন।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—সুইচটি আবার কাজ করতে শুরু করে।
ইঞ্জিন চালু হয়।
দুই নভোচারী সফলভাবে চাঁদ ছেড়ে মহাকাশে থাকা কমান্ড মডিউলে ফিরে যেতে সক্ষম হন।
পরে নাসা ভবিষ্যতের সব লুনার মডিউলে এই ধরনের সুইচের ওপর অতিরিক্ত সুরক্ষা আবরণ যুক্ত করে।
২১ দিনের কোয়ারেন্টিন
২৪ জুলাই অ্যাপোলো–১১ পৃথিবীতে ফিরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে।
কিন্তু তখনই শুরু হয় আরেকটি অধ্যায়।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না চাঁদ থেকে কোনো অজানা জীবাণু পৃথিবীতে এসেছে কি না।
তাই তিন নভোচারী—
নীল আর্মস্ট্রং
বাজ অলড্রিন
মাইকেল কলিন্স
—কে সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে যেতে দেওয়া হয়নি।
তাঁদের প্রথমে একটি মোবাইল কোয়ারেন্টিন ইউনিটে, পরে হিউস্টনের লুনার রিসিভিং ল্যাবরেটরিতে রাখা হয়।
চাঁদে অবতরণের দিন থেকে হিসাব করে ২১ দিন পূর্ণ হওয়ার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে তাঁদের শরীরে কোনো অজানা জীবাণু নেই।
এরপর ১০ আগস্ট তাঁদের কোয়ারেন্টিন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
চাঁদের পাথর নিয়ে বিতর্ক
অ্যাপোলো–১১ অভিযানের পর নাসা বিশ্বের বহু দেশকে সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে চাঁদের ছোট ছোট শিলাখণ্ড উপহার দেয়।
তবে পরবর্তী সময়ে নেদারল্যান্ডসে একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত তথাকথিত "চাঁদের পাথর" পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি আসলে চাঁদের নয়; বরং সম্ভবত অ্যারিজোনার একটি সাধারণ পাথরে পরিণত হওয়া কাঠের জীবাশ্ম।
পরে পরিষ্কার হয়, এটি নাসার আনুষ্ঠানিক উপহার ছিল না; বরং একটি ব্যক্তিগত উপহারকে ভুলবশত চাঁদের পাথর হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে নাসার দেওয়া প্রকৃত "গুডউইল মুন রক" এখনো নেদারল্যান্ডসের লেইডেনের মিউজিয়াম বোরহাভেতে সংরক্ষিত রয়েছে।
আবার চাঁদে ফেরার প্রস্তুতি
অ্যাপোলো–১৭ অভিযানের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে মানুষের চাঁদে যাওয়া শেষ হয়।
এরপর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় কেউ চাঁদে যায়নি।
এখন নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির মাধ্যমে আবার মানুষকে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে মানুষ আবার পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে ভ্রমণ করেছে। আগামী ধাপে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে মানুষ অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে—যেখানে আগে কখনো কোনো মানুষ পা রাখেনি।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিযানের আড়ালের গল্প
আজ থেকে কয়েক দশক আগে টেলিভিশনের পর্দায় যে দৃশ্যটি ছিল নিখুঁত সাফল্যের প্রতীক, সময়ের সঙ্গে প্রকাশিত নথি ও স্মৃতিকথা জানাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ ছিল শুধু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির নয়, বরং মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, প্রকৌশলীদের দ্রুত বিচক্ষণতা, নভোচারীদের উপস্থিত বুদ্ধি এবং অজানা ঝুঁকির বিরুদ্ধে মানুষের অসাধারণ সাহসেরও এক অনন্য উদাহরণ।
রহস্যময় ‘১২০২’ কম্পিউটার অ্যালার্ম, হাতে গোনা কয়েক সেকেন্ডের জ্বালানি, একটি প্রস্তুত শোকবার্তা এবং শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ ফেল্ট-টিপ কলম—এসবই প্রমাণ করে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় মহাকাশ অভিযানের সফলতার পেছনে কখনো কখনো সবচেয়ে সাধারণ একটি বস্তুই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে অসাধারণ নায়ক।