
টানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার মধ্যে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরে বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নেন তিনি। পরে লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আগামী এক দশকের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।
এর আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
বার্নহ্যামের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে গত চার বছরে যুক্তরাজ্য পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী পেল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত অল্প সময়ে বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তন ব্রিটিশ রাজনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এমন বাস্তবতায় নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
‘আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম না’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া প্রথম ভাষণে আত্মসমালোচনার সুরে বার্নহ্যাম বলেন,
“আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম না। আমাদের আরও ভালো হতে হবে। আমরা তা-ই হব।”
তিনি জানান, চলতি বছরের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের জন্য একটি ১০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে। ওই পরিকল্পনায় অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরা হবে।
বার্নহ্যামের মতে, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করাই হবে তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
কীভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন বার্নহ্যাম
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ ফলের পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। দলীয় চাপের মুখে স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এরই মধ্যে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও হাউস অব কমন্সে ফিরে আসেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। পরে দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি লেবার পার্টির নতুন নেতা হন।
সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লস সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী তাঁকে সরকার গঠনের আহ্বান জানালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
‘আজ থেকেই নতুনভাবে শুরু’
ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া ভাষণে বার্নহ্যাম বলেন, বর্তমান সময়টি যুক্তরাজ্যের জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’।
তিনি বলেন,
“আজকের মুহূর্তটি যুক্তরাজ্যের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। আজ থেকেই আমরা নতুনভাবে শুরু করছি।”
নতুন প্রধানমন্ত্রী জানান, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকারের কর্মসূচি পরদিন থেকেই ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন অঞ্চলের হাতে আরও বেশি প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
অর্থনীতি ও শিল্প পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি
বার্নহ্যাম বলেন, তাঁর সরকার যুক্তরাজ্যকে আবার একটি শক্তিশালী শিল্পোন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবে।
তিনি জানান, উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে, শিল্পকারখানার সক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
গৃহহীনতা দূর করার অঙ্গীকার
সামাজিক নীতির বিষয়ে বার্নহ্যাম বিশেষ গুরুত্ব দেন গৃহহীন মানুষের সংকটকে।
তিনি বলেন,
“আমাদের দেশের কাউকে যেন রাস্তায় রাত কাটাতে না হয়—এটাই হবে আমার প্রথম নির্দেশ।”
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আরও বেশি কাউন্সিল হাউস নির্মাণ, সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের ঘোষণা দেন তিনি।
এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, জনসেবার মানোন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাকে আরও সহজলভ্য করার প্রতিশ্রুতিও দেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিরক্ষা ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা
বার্নহ্যাম জানান, যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে।
ভাষণের শেষ অংশে তিনি জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন,
“মানুষের যত্ন নেওয়াই হবে আমার সরকারের কেন্দ্রবিন্দু। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমরা নতুন একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলব। আজ সেই দিন, যেদিন ব্রিটেন আবার বিশ্বাস করতে শুরু করবে, যেদিন আমরা আশা ফিরিয়ে আনব।”
ভাষণ শেষে উপস্থিত সমর্থকদের করতালির মধ্যে স্ত্রী মেরি-ফ্রান্স ভ্যান হিলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন।
নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বার্নহ্যামের প্রথম বড় প্রশাসনিক কাজ হবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন।
ইতোমধ্যে আগের সরকারের কারাগারবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড টিম্পসন পদত্যাগ করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, দিনভর নতুন মন্ত্রী নিয়োগ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ চলবে।
তবে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
কে এই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জন্ম ইংল্যান্ডের মেরসিসাইডে। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো লেবার পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময় তিনি স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক বিষয়ক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সফল হননি। পরে ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র নির্বাচিত হন এবং টানা তিন মেয়াদে সেই দায়িত্ব পালন করেন।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতা ভেঙে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, জনসেবার চাপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানও তাঁর সরকারের সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠবে।
চার বছরে পাঁচ প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের পর যুক্তরাজ্যের জনগণ এখন নতুন নেতৃত্বের কাছ থেকে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং অর্থনীতি, জনসেবা ও জীবনমানের বাস্তব উন্নতির প্রত্যাশা করছে। বার্নহ্যামের ঘোষিত ১০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, সেটিই আগামী দিনের ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠবে।