
লাদাখের পরিবেশবাদী ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক টানা ২৬ দিনের অনশন শেষে তা ভেঙেছেন। তবে তিনি অনশন প্রত্যাহার করলেও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহির দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে কেন্দ্রীয় সরকারের দুই মন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর অনশন ভাঙেন ওয়াংচুক।
২৬ দিনের অনশনের ইতি
গত প্রায় এক মাস ধরে সোনম ওয়াংচুক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন পালন করছিলেন।
অনশন চলাকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে তিনি অনশন ভাঙেন।
দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আশ্বাসের পর সিদ্ধান্ত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ওয়াংচুক জানান, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং লেহ লাদাখ অ্যাপেক্স বডির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে তিনি অনশন ভেঙেছেন।
তিনি জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ৬৫ জন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে অথবা চিঠির মাধ্যমে তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।
ওয়াংচুক বলেন, দীর্ঘ আলোচনা, বিভিন্ন শর্ত নিয়ে সমঝোতা এবং দেশে সম্ভাব্য সহিংস পরিস্থিতি এড়ানোর স্বার্থেই তিনি অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে সরকারের সঙ্গে কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তার বিস্তারিত তিনি পরে আলাদা একটি ভিডিও বার্তায় প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছেন।
সরকারের দুটি আশ্বাস
ওয়াংচুকের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি এবং সামগ্রিক শিক্ষা সংকট নিয়ে ভারতের সংসদে একটি অর্থবহ আলোচনা আয়োজন করা হবে।
যদিও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে সরকার সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
মোদির শুভকামনা
সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তিনি লিখেছেন, ওয়াংচুক যেন চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলেন এবং দ্রুত আগের শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পান।
মোদি তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাও করেন।
আন্দোলন চলবে: সিজেপি
ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও আন্দোলন থামছে না বলে স্পষ্ট করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ২৬ দিনের অনশন শেষে সোনম ওয়াংচুকের সুস্থতার খবর তাঁদের স্বস্তি দিয়েছে।
তিনি বলেন, ওয়াংচুক নিজের জীবন বাজি রেখে পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে সিজেপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।
সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান
অনশন ভাঙার আগেই আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে একটি বার্তা দেন সোনম ওয়াংচুক।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু সমাজবিরোধী ও উসকানিদাতা গোষ্ঠী আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলন পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ থাকলেও দেশের অন্য কোথাও কিছু অপশক্তি এই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সহিংসতা সৃষ্টি করতে চাইছে।
ওয়াংচুক সবাইকে অহিংস থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিস্থিতি যেমনই হোক, তাঁদের প্রতিক্রিয়া হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিপক্ষ যা-ই করুক না কেন, আমাদের প্রতিক্রিয়া হবে শুধুই ফুল।’
অনশনের আগে সরকারের সঙ্গে বৈঠক
অনশন ভাঙার আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং মেদান্ত হাসপাতালে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এর আগে তিনি দুই মন্ত্রীর উদ্দেশে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন।
সেই চিঠিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি সরাসরি উল্লেখ না করলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায় নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং সংসদে বিষয়টি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আন্দোলনের নতুন অধ্যায়
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোনম ওয়াংচুকের অনশন শেষ হলেও আন্দোলনের মূল দাবি এখনো পূরণ হয়নি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করে আন্দোলনের নেতৃত্বকে নতুন কৌশলে এগিয়ে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে সিজেপি স্পষ্ট করে দিয়েছে, দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে অব্যাহত থাকবে।