
২০২৬ সালের জুলাই মাস স্প্যানিশ ফুটবলের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভিন্ন ভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত তিনটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রতিবারই শিরোপা জিতেছে স্পেন। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ওয়েলসে অনূর্ধ্ব-১৯ পুরুষ ইউরো এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ইউরোও নিজেদের করে নেয় তারা।
বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে স্পেন। এই সাফল্যের মাধ্যমে দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগের বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করে। এর আগে ২০২৩ সালে নারী দল এবং ২০২৪ সালে পুরুষ দল ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
একসময় বড় আসরে বারবার হতাশ করা দল হিসেবেই পরিচিত ছিল স্পেন। ২০০৪ সালের পর ফুটবলের কাঠামোতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে একই দর্শনে খেলোয়াড় তৈরি, আধুনিক কোচিং এবং নির্দিষ্ট খেলার ধরন গড়ে তোলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বদলে যায় তাদের চিত্র।
এর ফল হিসেবে গত দুই দশকে ইউরো ও বিশ্বকাপ—দুই আসরেই ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে স্প্যানিশরা।
স্পেনের জাতীয় দলের অধিকাংশ ফুটবলার ছোটবেলা থেকেই একই কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠেন। অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলে একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েই তারা সিনিয়র দলে জায়গা করে নেন।
বর্তমান দলের রদ্রি, উনাই সিমন, মিকেল মেরিনো, ফাবিয়ান রুইজ, দানি ওলমো কিংবা মিকেল ওইয়ারসাবাল—অনেকেই বয়সভিত্তিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছেন। একই ধারা নারী দলেও দেখা যায়, যেখানে তরুণ ফুটবলারদের ধাপে ধাপে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
শুধু সিনিয়র নয়, জুনিয়র পর্যায়েও স্পেনের দাপট স্পষ্ট। এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ পুরুষ ইউরোতে তারা অপরাজিত থেকে শিরোপা জিতে পুরো আসরে একটি গোলও হজম করেনি। অন্যদিকে অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ইউরোতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন।
এতে বোঝা যায়, দেশটির সাফল্য কোনো এক প্রজন্মের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে নতুন খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে।
স্পেন শুধু ফুটবলার নয়, দক্ষ কোচ তৈরিতেও বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ। দীর্ঘদিন ধরেই কোচিং শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ করেছে তারা। ফলে দেশটির অনেক কোচ এখন ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর দায়িত্বে রয়েছেন।
এই শক্তিশালী কোচিং কাঠামোই জাতীয় দল থেকে শুরু করে ক্লাব ফুটবল পর্যন্ত একই ধরনের দর্শন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্পেনের ফুটবলের মূল ভিত্তি তিনটি নীতিতে দাঁড়িয়ে—বল দখলে রাখা, সঠিক অবস্থান বজায় রাখা এবং প্রতিপক্ষের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা। এই কৌশল দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করায় বয়সভিত্তিক দল থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত প্রায় একই ধরনের ফুটবল খেলে স্প্যানিশরা।
লা মাসিয়া একাডেমি বহু বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করলেও স্পেনের সাফল্যকে শুধু একটি ক্লাবের অবদান বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। দেশের বিভিন্ন ক্লাব, ফুটবল ফেডারেশনের পরিকল্পনা, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামো মিলেই আজকের শক্তিশালী স্পেনকে তৈরি করেছে।
অন্যান্য অনেক দেশের মতো স্পেনের সাফল্য কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং সংগঠিত দলগত পারফরম্যান্স, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং একে অপরের প্রতি আস্থাই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি সমষ্টিগত ফুটবলকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে স্পেন।