
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ২১ মাস আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন মো. সাহাবুদ্দিন। অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও তাঁর বিদায় ঘটেছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক ও সাংবিধানিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে। পদত্যাগের পর তিনি রাজধানীর গুলশানে নিজের ব্যক্তিগত বাসভবনে উঠবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পাঠান। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে স্পিকার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বলেও জানান।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং স্পিকারের সাংসদীয় দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
গুলশানের বাসায় নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা সামনে রেখেই কয়েক দিন ধরে গুলশানে অবস্থিত মো. সাহাবুদ্দিনের ব্যক্তিগত বাসভবন বসবাসের উপযোগী করে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। পরিবারের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও ব্যক্তিগত সামগ্রীও ইতোমধ্যে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে বঙ্গভবন ছাড়ার পর তিনি সরাসরি নিজের বাসায় উঠবেন।
মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। পাঁচ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ অনুযায়ী তাঁর দায়িত্বে থাকার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই তাঁর রাষ্ট্রপতির অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
স্পিকার বললেন, অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ
সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি গুরুতর অসুস্থ। হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম নন। এ কারণেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একই সঙ্গে স্পিকার বলেন, যদিও মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি তিনি সবসময় সমর্থন ও সাংবিধানিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।
পদত্যাগপত্রে নিজের ভূমিকার মূল্যায়ন
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালনের সময়কার ভূমিকার মূল্যায়নও তুলে ধরেছেন।
তিনি লিখেছেন, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সে সময় সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়া এবং আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল।
তাঁর ভাষায়, তাঁর ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণেই দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
যেসব অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন নিজের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনির জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচারও হয়েছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ ধরা পড়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়েন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হওয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে পদত্যাগপত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপ, সরকার বা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে মতবিরোধের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।
কয়েক দিন ধরেই চলছিল প্রস্তুতি
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছিল কয়েক দিন আগেই। সরকার ও বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, তাঁকে পদত্যাগের বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও আলোচনা চলছিল।
বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার মো. সাহাবুদ্দিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং নিজের দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও চলতি মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলেন। তাঁর মনোনীত কয়েকজন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত মালামাল গুছিয়ে নিয়েছেন।
কীভাবে দায়িত্ব নিলেন স্পিকার
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন বঙ্গভবন থেকে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদে নিয়ে যান। বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকারের কাছে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার বলেন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং সংসদ সচিবালয়কে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও তিনি নিয়েছিলেন। একইভাবে ডেপুটি স্পিকার প্রয়োজনে স্পিকারের দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটি কালো ছায়া সরে গেছে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুধু পদত্যাগে সন্তুষ্ট নয়। দলটি মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করতে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পুনরুত্থান ঠেকাতে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পৃথক বিবৃতিতে তাঁর পদত্যাগকে স্বাগত জানালেও অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত বিচার দাবি করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থান থেকে নির্বাচন পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্র ছিল বঙ্গভবন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।
সেদিন রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা জানান এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া, সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্বও পালন করেন।
তবে আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে তাঁকে অপসারণের দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচিও হয়। যদিও সে সময় রাজনৈতিক ঐকমত্য না হওয়ায় তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথে দেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। এরপর থেকেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের মাধ্যমে পরিণতি পেল।
এখন সংবিধানের বিধান অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।