
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পারমাণবিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করবে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের প্রশ্ন, এ চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান ‘১২৩ চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শক্তি আইনের ১২৩ নম্বর ধারার আওতায় সম্পাদিত এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সরবরাহ করতে পারে।
যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এটি মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি–মার্কিন চুক্তিতে কী রয়েছে
চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে কর্মসূচিটি যেন অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে না এগোয়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তদারকির ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো দেশের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
চুক্তিটি এখন মার্কিন কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য যাবে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতার আপত্তি থাকলেও বিরোধিতা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলে ৯০ দিনের পর্যালোচনা শেষে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।
ইরান: শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নাকি অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা?
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি ইরানের।
১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির আওতায় ইরানের পারমাণবিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-তে যোগ দেয়।
প্রথমদিকে জার্মানির সহায়তায় বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইস্পাহানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলে তেহরান। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ ওঠে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ) চুক্তিতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখতে সম্মত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) নজরদারির সুযোগ দেয়।
তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিলে ইরানও ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়াতে শুরু করে।
২০২৫ সালে আইএইএ জানায়, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের খুব কাছাকাছি।
ইসরায়েল: স্বীকৃতি না দিলেও পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে রহস্যঘেরা পারমাণবিক কর্মসূচি ইসরায়েলের।
দেশটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ইসরায়েলই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র বাস্তব পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ (এনটিআই)-এর হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের হাতে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৩০০টি অস্ত্র তৈরির মতো প্লুটোনিয়াম ও ইউরেনিয়াম মজুত আছে বলে ধারণা করা হয়।
১৯৫৭ সালে ফ্রান্সের সহায়তায় ডিমোনায় নির্মিত শিমন পেরেস নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টারই দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু।
ইসরায়েল এনপিটি স্বাক্ষর করেনি। ফলে আইএইএও দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা নিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগ পায় না।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: সবচেয়ে স্বচ্ছ বেসামরিক কর্মসূচি
সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২৩ চুক্তি স্বাক্ষর করে।
দেশটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছে, তারা নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতও করবে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিতে নির্মিত বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যা আমিরাতের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ করে।
আইএইএর পূর্ণাঙ্গ নজরদারির আওতায় পরিচালিত হওয়ায় এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে স্বচ্ছ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তুরস্ক: বেসামরিক কর্মসূচি থেকে অস্ত্রের সম্ভাবনা?
তুরস্কের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই। তবে ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে।
রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত আক্কুয়ু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার পর তুরস্কের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে দেশটির ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে।
মিসর: বিদ্যুৎ উৎপাদনই মূল লক্ষ্য
মিসর এনপিটি স্বাক্ষরকারী দেশ।
রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন আল-দাবা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে।
১৯৬০-এর দশকে ইসরায়েলের পাল্টা শক্তি হিসেবে গোপন সামরিক কর্মসূচি নেওয়া হলেও সেটি সফল হয়নি। বর্তমানে দেশটির কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
ইরাক: ধ্বংস হওয়া কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা
সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরাক গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেছিল।
ফ্রান্সের সহায়তায় নির্মিত ওসিরাক রিঅ্যাক্টরে ১৯৮১ সালে ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়। পরে উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।
বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বাগদাদ।
পাকিস্তান: মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হলেও গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি
মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী পাকিস্তান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের হাতে প্রায় ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। ভারতের হাতে রয়েছে প্রায় ১৯০টি।
১৯৭০-এর দশকে ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর উদ্যোগে পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করে। পরে বিজ্ঞানী আবদুল কাদের খানের নেতৃত্বে দেশটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা অর্জন করে।
পাকিস্তান ও ভারত—কোনো দেশই এনপিটি চুক্তির সদস্য নয়।
নতুন চুক্তি ঘিরে উদ্বেগ কেন
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পারমাণবিক চুক্তি কেবল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িত।
একদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, অন্যদিকে ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক সক্ষমতা—এই বাস্তবতায় সৌদি আরবের কর্মসূচি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কঠোর তদারকি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই এই সহযোগিতা বাস্তবায়ন করা হবে এবং এর মাধ্যমে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।