
১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের যৌথ কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে খেলাফত মজলিস। দলটি জানিয়েছে, এখন থেকে তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি স্বাধীনভাবে পালন করবে। তবে জাতীয় স্বার্থ, ইসলামের স্বার্থ কিংবা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রয়োজন দেখা দিলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
শনিবার (২৬ জুলাই) সকালে রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় দলটি।
এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে খেলাফত মজলিস ১১-দলীয় ঐক্যের যৌথ কর্মসূচি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করল।
‘নির্বাচনী সমঝোতার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে’
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে খেলাফত মজলিস জানায়, ১১-দলীয় ঐক্য মূলত জাতীয় নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচনী সমঝোতা ছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেই জোটের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে এবং বাস্তবিক অর্থে এর কার্যকারিতাও শেষ হয়ে গেছে।
দলটি জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ১১-দলীয় ঐক্যের কয়েকটি কর্মসূচিতে তারা অংশ নিলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে আর ওই জোটের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবে না।
তবে দলটি স্পষ্ট করেছে, এটি রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নয়; বরং ভবিষ্যতে জাতীয় প্রয়োজন দেখা দিলে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের সুযোগ খোলা থাকবে।
এককভাবে কর্মসূচি পালন করবে দল
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী বলেন, এখন থেকে দলটি নিজস্ব ব্যানারে কর্মসূচি আয়োজন করবে।
তিনি জানান, খেলাফত মজলিসের আয়োজিত কর্মসূচিতে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা চাইলে বক্তব্য রাখতে পারবেন। একইভাবে প্রয়োজন হলে খেলাফত মজলিসের নেতারাও অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন।
তাঁর মতে, যৌথ কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক যোগাযোগ বা পারস্পরিক সম্পর্কের সমাপ্তি নয়।
সংসদে বিরোধীদলীয় ভূমিকা অব্যাহত থাকবে
দলটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদে খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যরা আগের মতোই বিরোধীদলীয় ভূমিকা পালন করবেন।
একই সঙ্গে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
শুরা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন শীর্ষ নেতারা
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দলের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের।
এতে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফরিদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক, মাওলানা সাইয়্যেদ ফেরদাউস বিন ইসহাক, মুফতি আবদুল হামিদ, যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর হোসাইন, সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসানসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও মজলিসে শুরার সদস্যরা।
সরকারের প্রতি সমালোচনা
অধিবেশনে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করেন খেলাফত মজলিসের নেতারা।
তাঁদের অভিযোগ, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের পূর্ণাঙ্গ রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
নেতাদের ভাষ্য, জনগণের দেওয়া গণরায় উপেক্ষা করে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাঁরা দাবি করেন, জনগণ এমন একটি সাংবিধানিক সংস্কার চায়, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সব পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি
খেলাফত মজলিসের নেতারা বলেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সংসদের মাধ্যমে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, সরকার যদি গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে সংকটের মুখে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে তাঁরা জুলাই ও শাপলা হত্যাকাণ্ডসহ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ারও দাবি জানান।
সেপ্টেম্বরে গণসমাবেশ, স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা
শুরা অধিবেশনে গণভোটের গণরায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরগুলোতে গণসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যথাসম্ভব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে দলটি।
১১-দলীয় জোটে অবস্থান নিয়ে ব্যাখ্যা
যদিও খেলাফত মজলিস যৌথ কর্মসূচি থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে, তবুও দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (ভিন্ন রাজনৈতিক দল) এখনো ১১-দলীয় ঐক্যের অংশ হিসেবেই রয়েছে। ফলে একই ধরনের নামের দুটি পৃথক রাজনৈতিক দলের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।