
ভারতের শীর্ষ প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি কানপুর (আইআইটি-কানপুর)-এ ভর্তি হতে না পেরে ক্ষোভে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ (হ্যাক) করেন এক শিক্ষার্থী। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে আইআইটি-কানপুর। দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারলে ভবিষ্যৎ ব্যাচে তাঁকে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ভর্তি না হওয়ার পরই ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ
সম্প্রতি আইআইটি-কানপুর প্রথমবারের মতো ব্যাচেলর অব সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম চালু করে। নতুন এ প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি আবেদন ফিও পরিশোধ করেন এবং সাইবার নিরাপত্তা–সংক্রান্ত নিজের কাজের নমুনাও জমা দেন।
তবে প্রাথমিক বাছাইয়ে তাঁর নাম না আসায় তিনি হতাশ হন। পরবর্তীতে তিনি আইআইটি-কানপুর এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মাদ্রাজ (আইআইটি-মাদ্রাজ)-এর ওয়েবসাইটের কিছু অংশে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করেন।
আইআইটি-কানপুরের ওয়েবসাইটে তিনি একটি বার্তাও রেখে যান। সেখানে লেখা ছিল—
"Site is hacked. All I need is just a fair chance."
অর্থাৎ, "ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়েছে। আমি শুধু একটি ন্যায্য সুযোগ চাই।"
‘ক্ষতি নয়, দক্ষতার প্রমাণ দিতে চেয়েছি’
ঘটনাটি চলতি সপ্তাহে প্রকাশ্যে আসে, যখন ওই শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) এবং রেডিটে পোস্ট করে দাবি করেন যে, আবেদন বাতিল হওয়ার পরই তিনি দুটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি ওয়েবসাইটে প্রবেশের স্ক্রিনশটও প্রকাশ করেন।
তাঁর দাবি, কোনো ধরনের ক্ষতি করা বা তথ্য নষ্ট করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং নিজের সাইবার নিরাপত্তা–সংক্রান্ত দক্ষতার প্রমাণ দিতেই তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, ভর্তিপ্রক্রিয়ার সব ধাপ সম্পন্ন করলেও সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান না পাওয়ায় তিনি হ্যাকাথনে অংশ নেওয়ার সুযোগও পাননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যদি দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে তিনি নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারতেন।
আইআইটি-কানপুর: এখন ভর্তি নয়, তবে ভবিষ্যতে সুযোগ মিলতে পারে
আইআইটি-কানপুরের পরিচালক মণীন্দ্র আগারওয়াল বলেন, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতার পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় ওই শিক্ষার্থীকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়নি।
তিনি জানান, চলতি শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আর তাঁকে ভর্তি করানো সম্ভব নয়। তবে তাঁকে ক্যাম্পাসে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে।
যদি পরীক্ষায় তিনি নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে তাঁকে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করল কর্তৃপক্ষ
মণীন্দ্র আগারওয়াল নিশ্চিত করেছেন যে, শিক্ষার্থীটি আইআইটি-কানপুর ও আইআইটি-মাদ্রাজের সরকারি ওয়েবসাইটের কিছু অংশে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রযুক্তিবিদদের ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁকে বোঝানো হবে যে, কোনো কম্পিউটার সিস্টেমে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা আইনত দণ্ডনীয় এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
এফআইআরের চিন্তা থাকলেও বদলেছে সিদ্ধান্ত
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইআইটি-কানপুরের এক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল।
তবে পরে তাঁর দাবি যাচাই এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তরুণ প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়ার নজির
তরুণ প্রযুক্তি প্রতিভাকে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইআইটি-কানপুরের আগেও ইতিবাচক উদ্যোগের নজির রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)-এর অনলাইন স্ক্রিন-মার্কিং পোর্টালের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করেছিলেন এক তরুণ। পরে তাঁকে আইআইটি-কানপুরের সি৩আইহাব (C3iHub)-এ কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়।
বর্তমান ঘটনাতেও আইআইটি-কানপুর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে দক্ষতা মূল্যায়ন ও সম্ভাবনাময় তরুণকে ইতিবাচক পথে যুক্ত করার নীতি অনুসরণ করছে। তবে একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ আইনবিরোধী এবং সাইবার নিরাপত্তা দক্ষতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও আইন ও নৈতিকতার সীমা মেনে চলা অপরিহার্য।