
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ গাজায় হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ধাপে ধাপে নিরস্ত্র করার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে গাজায় নতুন একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠিত হবে, যা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির বিষয়ে হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি। যদিও হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্মতিসূচক একটি খসড়া নথি আল জাজিরা-এর হাতে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি: গাজার জন্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামো
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এই সমঝোতা গাজার ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তিনি দাবি করেন, নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকার দায়িত্ব নেবে, যা জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এবং ‘বোর্ড অব পিস’-এর সঙ্গে সমন্বয় করবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, গাজা আর কোনো সশস্ত্র হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না এবং ইসরায়েল তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।
হামাসের অবস্থান: ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি না রাখলে চুক্তিও কার্যকর হবে না
হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির আওতায় ইসরায়েল যদি নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে হামাসও চুক্তির কোনো ধাপ কার্যকর করবে না।
তিনি জানান, হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল।
গাজি হামাদের ভাষ্য, নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের কোনো ভূমিকা থাকবে না। একটি জাতীয় কমিটি এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ’ বলে দাবি ট্রাম্পের
ট্রাম্প বলেন, ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণের এই পরিকল্পনা গত অক্টোবরে তাঁর মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিরই অংশ।
তাঁর দাবি, ওই চুক্তির মাধ্যমে গাজায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান হয়েছে। তবে একই সময়ে গাজায় সংঘাত, হতাহতের ঘটনা এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগও অব্যাহত রয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বারবার হামলা চালানো, নতুন এলাকা দখল, মানবিক সহায়তা ও পণ্য পরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবারও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সেনা প্রত্যাহার ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর পরিকল্পনা
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হওয়ার পর গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে।
এরপর সেখানে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে, যারা নবগঠিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে।
তাঁর ভাষ্য, শেষ পর্যন্ত গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব এমন একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে, যারা রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে।
কায়রোয় চলছে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা
গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকে হামাসের প্রতিনিধিরা মিসরের রাজধানী কায়রোয় অবস্থান করছেন।
সেখানে মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে আলোচনা চলছে।
হামাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে জানান, আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং চূড়ান্ত সমঝোতার বিষয়ে আশাবাদ রয়েছে।
হামাসের প্রশাসনিক সংস্থা বিলুপ্ত
গত ৬ জুলাই গাজায় নিজেদের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনিক সংস্থা বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয় হামাস।
এর মাধ্যমে উপত্যকাটিতে প্রায় দুই দশক ধরে চলা হামাসের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
গাজি হামাদ বলেন, এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে হামাস ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষার অবস্থান থেকে সরে এসেছে। বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি অ্যালান ফিশার জানান, নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজার বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র জমা নেওয়া হবে।
এর পাশাপাশি আরও ফিলিস্তিনি পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তারা একটি আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
এই বাহিনীতে কোন কোন দেশ থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আলোচনায় ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে।
১৪ দিনের মধ্যে অস্ত্রের তালিকা প্রস্তুতের লক্ষ্য
আল জাজিরার হাতে আসা সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, অস্ত্রের তালিকা প্রস্তুত এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য ১৪ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক যাচাই কমিশনের সম্মতিতে প্রয়োজনে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।
এখনো কিছু জটিলতা রয়ে গেছে
অ্যালান ফিশারের মতে, সব পক্ষকে চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর্যায়ে আনতে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধা রয়েছে।
তিনি জানান, হামাসকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, তারা যদি এই সমঝোতায় অংশ না নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
‘প্রযুক্তিনির্ভর, অরাজনৈতিক সরকার’ গঠনের ধারণা
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, বোর্ড অব পিসে তুরস্ক ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটিই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
ওই কর্মকর্তার দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) ও হামাসের বাইরে একটি বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তাঁর ভাষায়, এটি হবে একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও অরাজনৈতিক সরকার, যার প্রধান লক্ষ্য থাকবে গাজার মানুষের সেবা, পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।