
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে গত কয়েক মাস ধরে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক সংযম দেখানোর চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। এমনকি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নীতি গ্রহণ, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ এবং সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর কৌশলও অনুসরণ করেছে রিয়াদ।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই অবস্থান দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরান, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ধারাবাহিক হামলা ও হুমকির মুখে সৌদি আরব এখন সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, যেখানে সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে।
তিন দিক থেকে চাপের মুখে সৌদি আরব
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে সৌদি আরব একযোগে তিনটি নিরাপত্তা হুমকির মুখোমুখি।
একদিকে রয়েছে ইরান, অন্যদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থী সশস্ত্র মিলিশিয়ারা।
গত এক সপ্তাহে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন আক্রমণ এবং তেহরানের নতুন হুমকির পর সৌদি আরব সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে পূর্ব ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের বিভিন্ন অবস্থানে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় সৌদি বিমানবাহিনী।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত রিয়াদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, বড় পরিসরের আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
অর্থনৈতিক কৌশল এখন বড় চ্যালেঞ্জে
গত এক দশকে সৌদি আরব নিজেদের অর্থনীতিকে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনতে ব্যাপক সংস্কার শুরু করে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন, প্রযুক্তি এবং মেগা অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশটিকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার পরিকল্পনা নেয় রিয়াদ।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি করে সৌদি আরব।
কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে অপ্রথাগত যুদ্ধ পরিচালনায় দক্ষ সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুখোমুখি হওয়া যেকোনো সামরিক পরিকল্পনাকারীর জন্য সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিগুলোর একটি।
আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়
সৌদি আরব সামরিক আধুনিকীকরণে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে।
অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারি প্রযুক্তি সংগ্রহ করলেও দেশটির বিশাল ভৌগোলিক এলাকা ও বিস্তৃত তেল অবকাঠামো এখনো বড় ধরনের দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশাল উপকূলরেখা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা তেল স্থাপনাগুলোকে পুরোপুরি নিরাপত্তা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
হুতিদের নতুন হামলা বাড়িয়েছে উদ্বেগ
গত শনিবার লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।
স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন জাজান অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী দুটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়।
হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচল বন্ধেরও ঘোষণা দেয়।
সোমবার আরও একটি সৌদি জাহাজে হামলার দাবি করে গোষ্ঠীটি।
তেল রপ্তানি পরিকল্পনায় নতুন সংকট
হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরকে কেন্দ্র করে বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
আগামী কয়েক বছরে এই রুট দিয়ে দৈনিক প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার বাজারে যেতে হলে ইয়ানবু থেকে যাওয়া প্রায় সব জাহাজকেই বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়।
ফলে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানিকৃত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তেল এখন হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইয়েমেনে পুরোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতিদের উৎখাতে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি আরব।
টানা সাত বছরের যুদ্ধেও হুতিদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
বরং এই সংঘাত বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নেয়।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বর্তমানে হুতি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ওপর অর্থনৈতিক ও আকাশপথের অবরোধ বজায় রেখেছে সৌদি আরব।
নতুন সংঘাতের সূচনা
চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা অভিযোগ করে, ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি আরব বোমাবর্ষণ করেছে।
তাদের দাবি, তেহরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজকে অবতরণে বাধা দিতেই এই হামলা চালানো হয়।
ওই বিমানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর শেষকৃত্য থেকে ফেরা একটি হুতি প্রতিনিধিদল ছিল।
লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের বিশ্লেষক নাওয়াফ ওবেইদ বলেন, ওই বিমানে অন্য কোনো সামরিক সরঞ্জাম ছিল কি না, সেটিও সৌদি আরবের নজরে ছিল।
ইরাক থেকেও ড্রোন হামলা
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ইরাক থেকে ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা রাজধানী রিয়াদসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে বুধবার ভোরে পূর্ব ইরাকে ওই মিলিশিয়াদের ঘাঁটিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটি উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
মিলিশিয়াদের সংগঠন পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস জানিয়েছে, হামলায় তাদের কয়েকজন সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সমর্থিত ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
২০১৯ সালের হামলার স্মৃতি
সৌদি আরব এখনো ২০১৯ সালে আবকাইক তেল শোধনাগারে চালানো বড় হামলার অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেনি।
সেই হামলায় দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তখন হুতিরা দায় স্বীকার করলেও পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা ছিল, হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ইরাক এবং ইরানের ভূমিকা ছিল।
সেই সময় সৌদি আরব সরাসরি পাল্টা হামলা চালায়নি।
ইরানি ড্রোনের নতুন হুমকি
চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে ইরানের শাহেদ ড্রোনের হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরব ড্রোনবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রিয়াদ সফর করে সমন্বিত ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় প্রয়োজন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরের কয়েকটি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছে।
অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা
সংঘাতের প্রভাব সৌদি অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটি ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি ব্যয় বেড়েছে।
তেলের উচ্চমূল্যের কারণে কিছু অতিরিক্ত রাজস্ব এলেও উৎপাদন ও রপ্তানিতে নতুন কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হলে অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে সৌদি আরবের কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের আকারও ছোট করা হয়েছে।
সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতে যে অবস্থানে ছিল, এখন তার তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ইরান ও গাজা-সংক্রান্ত নীতির ঘন ঘন পরিবর্তনও রিয়াদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও সৌদি নেতৃত্বের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে গেলে আরও আগ্রাসী ইরানের মুখোমুখি তাদের একাই দাঁড়াতে হতে পারে।
একই সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে ওপেক থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়া, ইরাননীতি এবং ইয়েমেন ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে দুই দেশের মধ্যে আগের মতো সমন্বয় এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন, সৌদি আরব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দীর্ঘদিনের সংযমের নীতি থেকে সরে এসে এখন সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প খুব কম। তবে সেই পথই দেশটিকে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।