
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অন্যতম, আর এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে। প্রতিবছর আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, বায়ুদূষণ এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ দেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এমন বাস্তবতায় জলবায়ু, আবহাওয়া ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি গবেষক, বিজ্ঞানী ও উচ্চশিক্ষার্থীদের জন্য এসেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের গবেষণা উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ জিওসায়েন্স সম্মেলন আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের (AGU) ফল মিটিং ২০২৬–এ গবেষণা সারসংক্ষেপ (Abstract) আহ্বান করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সম্মেলনে গবেষণা সারসংক্ষেপ জমা দেওয়া এবং অংশগ্রহণের জন্য কোনো নিবন্ধন ফি দিতে হবে না।
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে সম্মেলন
বিশ্বের বৃহত্তম এই বৈজ্ঞানিক সম্মেলন আগামী ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো গবেষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকের অংশগ্রহণে এই সম্মেলন জিওসায়েন্স গবেষণার অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত।
এবারের আয়োজনে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি পৃথক বৈজ্ঞানিক সেশনের আয়োজন করা হয়েছে।
কানাডার সাসকাচেওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি গবেষক ও আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, এবারের বিশেষ সেশনের মূল লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত গবেষণাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান করে তোলা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের তরুণ এবং অভিজ্ঞ গবেষকদের একই প্ল্যাটফর্মে এনে তাঁদের গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সমাজের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
যেসব বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন করা যাবে
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত পরিসরের গবেষণা এই বিশেষ সেশনে উপস্থাপন করা যাবে।
গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বন্যা, খরা ও যৌগিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ
আবহাওয়া ও জলবায়ুর মডেলিং এবং মনিটরিং
মৌসুমি বায়ু (মনসুন) ও টেলিকানেকশন
বায়ুমান, দূষণ ও মানবস্বাস্থ্য
পার্বত্য অঞ্চল ও পরিবেশগত ঝুঁকি
জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব গবেষণার গুরুত্ব শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণেও এ ধরনের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশি গবেষকদের নেতৃত্বে বিশেষ সেশন
টানা তিন বছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বিশেষ সেশন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার একদল উদীয়মান গবেষক।
এ বছর সেশনের কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পাঁচজন আন্তর্জাতিক গবেষক—
ওয়েস্ট ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. সাহাবুল আলম
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার
পাকিস্তানের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটি ফয়সালাবাদের সাদিয়া হিনা
জার্মানির কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির নামেন্দ্র কুমার শাহী
কানাডার সাসকাচেওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মোস্তফা কামাল পলাশ
আয়োজকদের মতে, বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের এমন বৈজ্ঞানিক ফোরামে নিজেদের গবেষণা তুলে ধরার সুযোগ আগে এতটা সহজলভ্য ছিল না।
ভার্চ্যুয়াল অংশগ্রহণেরও সুযোগ
সম্মেলনে অংশ নিতে আগ্রহী গবেষকদের জন্য সরাসরি সান ফ্রান্সিসকোতে উপস্থিত হওয়ার পাশাপাশি ভার্চ্যুয়াল অংশগ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে।
ভিসা জটিলতা, ভ্রমণ ব্যয় কিংবা অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে যারা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন না, তারা জুম (Zoom) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে পারবেন।
ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংস্থার গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ আরও সহজ হয়ে উঠেছে।
গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন শুধু গবেষণাপত্র উপস্থাপনের সুযোগই তৈরি করে না; বরং বিভিন্ন দেশের গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতা, যৌথ গবেষণা এবং নতুন গবেষণা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো এবং অভিযোজন কৌশল উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সহযোগিতা কার্যকর অবদান রাখতে পারে।
সারসংক্ষেপ জমার শেষ সময়
আগ্রহী গবেষকদের গবেষণা সারসংক্ষেপ (Abstract) আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে জমা দিতে হবে।
জলবায়ু, আবহাওয়া, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশি গবেষক, শিক্ষক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গবেষণা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।