
গ্যাস, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হলে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তি থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ সরকার যেন ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বপ্ন না দেখে।
বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ১১–দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন।
কর্মসূচি থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম, ভুতুড়ে বিল, গ্যাসের সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি হিসেবে আগামী ১৪ নভেম্বর রাজধানীতে মহাসমাবেশ এবং চার বিভাগে লংমার্চের ঘোষণা দেওয়া হয়।
‘জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার ব্যর্থ’
বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার পাঁচ মাসের মধ্যে জনগণকে দেওয়া মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, “যদি সরকার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারে, বিদ্যুতের সংকট দূর করতে না পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তাহলে তারা যেন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন না দেখে।”
তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষ প্রতিদিন জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল এবং দ্রব্যমূল্যের চাপের মধ্যে জীবনযাপন করছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
‘গ্যাস নেই, তবু বিল দিতে হচ্ছে’
গ্যাসের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারকে অবিলম্বে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ থেকে সরে আসতে হবে।
তিনি বলেন, “গ্যাস নেই, কিন্তু মানুষকে বিল দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ। এসব কারণে নারীরাও এখন রাস্তায় নেমে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে বিক্ষোভ করছেন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় সরকার গ্রহণ করেনি এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণেও ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের শুরু থেকেই সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
‘প্রয়োজনে ২০২৬ সালেও আন্দোলন হবে’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলে আবারও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, “২০২৪ সালে বর্ষাবিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। প্রয়োজন হলে ২০২৬ সালেও হবে। সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে জনগণই তার জবাব দেবে।”
ক্যাম্পাস রাজনীতি নিয়েও অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি দাবি করেন, ছাত্রদল পুরোনো পদ্ধতিতে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তিনি জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেন কোনো একক ছাত্রসংগঠনের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়া হয়।
১০ দফা দাবিতে জ্বালানি খাতের সংস্কারের আহ্বান
অবস্থান কর্মসূচি থেকে ঘোষিত ১০ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল গত তিন মাসে আদায় করা ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে অবিলম্বে গণশুনানির আয়োজন, দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারের ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং অন্যান্য অতিরিক্ত চার্জ বাতিলের দাবি জানানো হয়। গত তিন মাসে এসব খাতে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ কোনো আবেদন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়।
বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পোস্টপেইড বিলের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে মিটার রিডিং লগ সংযুক্ত করা এবং প্রিপেইড মিটারের সফটওয়্যার ও বিলিং ব্যবস্থার স্বাধীন অডিট পরিচালনার দাবিও জানানো হয়।
‘গ্যাস না থাকলে বিল নয়’
দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘গ্যাস না থাকলে বিল নয়’ নীতি বাস্তবায়ন।
১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা বলেন, সরবরাহহীন সময়ের জন্য কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে গ্যাস বিল আদায় করা যাবে না।
একই সঙ্গে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, কূপ খনন, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।
মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ এবং পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার দাবিও কর্মসূচি থেকে উত্থাপন করা হয়।
শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার আহ্বান
বক্তারা বলেন, গ্যাসের সিস্টেম লস, চুরি ও অপচয় রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্মার্ট মিটার চালু, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং পুরোনো পাইপলাইন সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র থেকেই অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
শিল্প, ব্যবসা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষার পাশাপাশি এলপিজি ও সিএনজির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।
এ ছাড়া জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে কার্যকর নজরদারি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অলি আহমদের সমালোচনা
কর্মসূচিতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি বেড়েছে। তাঁর মতে, দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয় এবং জনগণের দাবি আদায়ে রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে।
১৪ নভেম্বর মহাসমাবেশের ঘোষণা
অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আগামী ১৪ নভেম্বর রাজধানীতে একটি মহাসমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে চারটি বিভাগে লংমার্চ কর্মসূচিও পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুখলেসুর রহমান কাসেমী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং ডিপিডিসি শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আনম বজলুর রহমানসহ ১১–দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা।