
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ ছয় মাসের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মধ্যে অস্ত্রের ঘাটতি এবং প্রেসিডেন্টকে দেওয়া তথ্য নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প—তিন পক্ষই এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রশাসনের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কোনো সংকট নেই এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রেসিডেন্টকে বিভ্রান্ত করেছেন—এমন অভিযোগও ভিত্তিহীন।
ক্যাম্প ডেভিডে বৈঠক ঘিরে বিতর্ক
মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মধ্যে অস্ত্রের মজুত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার বৈঠকের বিরতিতে ট্রাম্প জানতে চান, কেন দ্রুত কমে আসা অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত সম্পর্কে তাঁকে আগে সঠিকভাবে অবহিত করা হয়নি অথবা বিষয়টি কেন গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়নি।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ওই বৈঠকে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি মনে করেছিলেন অস্ত্রের ঘাটতির সমস্যা ইতোমধ্যেই সমাধান হয়ে গেছে।
ডেপুটির ওপর দায় চাপানোর দাবি
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ পরিস্থিতির জন্য নিজের ডেপুটি স্টিফেন ফেইনবার্গকে দায়ী করেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রেসিডেন্টকে অস্ত্রের প্রকৃত মজুত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ার জন্য হেগসেথ তাঁর উপপ্রতিনিধির ওপর দায় চাপান।
তবে এ বিষয়ে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায় স্বীকার করেনি।
অস্ত্রের মজুত কতটা কমেছে?
যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন বিশ্লেষণে।
গত মাসে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল—
২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
৪৫২টি টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (THAAD) বা থাড সিস্টেম।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
বর্তমানে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংখ্যা ৭৫৯ থেকে ৮২৭টির মধ্যে এবং থাড সিস্টেমের সংখ্যা ২৩৪ থেকে ২৭৮টির মধ্যে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতে থাকলে এসব কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুনরায় উৎপাদন ও মজুত পুনর্গঠন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার
গত মাসে সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী বাইডেন প্রশাসন প্রতিরক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যার ফলে অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যমান মজুত পুনর্নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ৬৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চেয়েছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের কঠোর অস্বীকৃতি
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই হোয়াইট হাউস তা নাকচ করে দেয়।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ট্রাম্প ও হেগসেথের মধ্যে প্রতিবেদনে বর্ণিত ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
ট্রাম্প: অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অস্ত্রসংকটের খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কোনো ঘাটতি নেই এবং দেশের কাছে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।
তাঁর মতে, অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে যেসব উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পেন্টাগনের বক্তব্য
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেলও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ কখনোই অস্ত্রের মজুত নিয়ে প্রেসিডেন্ট বা অন্য কাউকে বিভ্রান্ত করেননি।
তাঁর ভাষায়, প্রশাসনের অভ্যন্তরে মতবিরোধ বা গোপন দ্বন্দ্বের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা ‘সম্পূর্ণ কাল্পনিক’।
প্রকাশ্যে প্রশংসা হেগসেথের
সংবাদমাধ্যমে ট্রাম্প ও হেগসেথের সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হলেও শুক্রবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যেই প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিচালনার সাহসিকতা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার দৃঢ় সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই নিয়েছেন।
হেগসেথের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ট্রাম্পের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন একদিকে বিপুল সামরিক ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন অস্ত্রসংকটের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে, তবু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মজুত বজায় রাখা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।