
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিবেশী কোনো দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ দুই দেশের সুসম্পর্কের জন্য সহায়ক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শনিবার ঢাকায় খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের নিয়মিত মাসিক বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে মামুনুল হক এসব কথা বলেন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন দলের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ। বৈঠক শেষে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর বক্তব্য ও আলোচনার বিষয়গুলো জানানো হয়।
সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব
মামুনুল হক বলেন, জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতার রক্তের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে, তার স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতাকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্মান করা উচিত। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে পারস্পরিক মর্যাদা ও সার্বভৌম সমতার নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ককে শক্তিশালী করার বদলে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মামুনুল হকের বক্তব্যে একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। তবে তিনি জোর দেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের সরকারকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন খেলাফত মজলিসের আমির।
তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের জনগণের সিদ্ধান্তই প্রধান হওয়া উচিত।
জুলাই–আগস্টের গণহত্যাসহ জনগণের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিচার করতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের আইনের মুখোমুখি করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তাঁর মতে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিদ্যুৎ বিল ও লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ
বৈঠকে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মামুনুল হক। তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ও ‘ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপানো হচ্ছে। একই সময়ে মফস্সল ও গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক লোডশেডিং চলছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির কারণে যখন সাধারণ মানুষ এমনিতেই অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, তখন বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের বোঝা তাদের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় মানুষকে অতিরিক্ত ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে।
মামুনুল হক বলেন, একদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না পাওয়ার সমস্যা—দুটি বিষয় একসঙ্গে জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
তিনি বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও ভুতুড়ে বিলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে মফস্সল ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়েও উদ্বেগ
দেশের গৃহস্থালি, শিল্পকারখানা ও পরিবহন খাতে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে বলেও বৈঠকে মন্তব্য করেন খেলাফত মজলিসের আমির।
তিনি বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মামুনুল হকের অভিযোগ, সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘসূত্রতা না করে দ্রুত বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাই নয়, দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের আহ্বান
মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিশেষ করে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষা এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন যেন জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে সরকারকে দৃঢ় ও দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে অন্যান্য নেতারা
খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের নিয়মিত মাসিক এ বৈঠকে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে দলের নায়েবে আমির মাওলানা মাহবুবুল হক, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা আবদুল আজীজ, মুফতি শরাফত হোসাইন ও মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলালসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের আলোচনায় দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্ব পায়।
সব মিলিয়ে খেলাফত মজলিসের আমিরের বক্তব্যে একদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা এবং জাতীয় স্বার্থে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।