
সিএনএন
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। দীর্ঘ এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে এখন সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও অন্যান্য বিকল্প কৌশল বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইনও মনে করছেন, শুধু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে। বরং যুদ্ধ আরও তীব্র করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর বদলে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করছেন জেনারেল কেইন। এ নিয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ।
কেইনের এই অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন। ট্রাম্প কয়েক দিন আগেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতা না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে একই সময়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।
বিমান হামলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
গত মাসের শেষ দিকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে জেনারেল কেইন বলেছিলেন, ইরানে বিমান হামলা চালানোর যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা সীমিত হয়ে এসেছে। তাঁর এই উদ্বেগ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা দলের আরও অনেক কর্মকর্তার মধ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ কারণে জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে হামলার পরিধি আরও বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কারণ, নতুন করে বড় ধরনের হামলা শুরু হলে সংঘাত শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, মিত্রদেশগুলোর অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোও পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সিএনএনের সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনার পক্ষে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের কিছু অংশ ছিল। ইসরায়েলও এই পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্রদেশের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।
এসব মিত্রদেশের আশঙ্কা ছিল, ইরানে বড় ধরনের হামলা হলে তেহরান পাল্টা জবাব হিসেবে তাদের জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অস্ত্রের মজুতও বড় উদ্বেগ
ইরানে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্রের মজুত কমে আসাও একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওই অঞ্চলের কর্মকর্তারা মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান পাল্টা হামলা শুরু করলে কমে যাওয়া মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়ে তা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে যুদ্ধের পরিধি বাড়ানো হলে শুধু ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক অবকাঠামো রক্ষায় আরও বেশি সম্পদ ব্যয় করতে হতে পারে।
এই বাস্তবতা জেনারেল কেইনের সামরিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা নিয়ে ভিন্নমত
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো ও সেতুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন। তাঁর ধারণা, এ ধরনের হামলা ইরানের ওপর চাপ বাড়াবে এবং তেহরানকে যুদ্ধের অবসানের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কিন্তু মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের একাংশ মনে করছে, এ ধরনের কৌশল প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। সূত্রগুলোর মতে, বেসামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালালে ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং সরকারের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনের বদলে ইরানের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করলেও রাজনৈতিকভাবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধা তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
জেনারেল কেইনের মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। তাঁর মতে, শুধু বোমা হামলা চালিয়ে ইরানকে এমন অবস্থায় নেওয়া কঠিন, যেখানে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আত্মসমর্পণ করবে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ
ইরান যুদ্ধের সামরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়েও সতর্ক জেনারেল কেইন।
সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে ট্রাম্প ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে কেইন সম্ভাব্য হামলা বাড়ানোর নেতিবাচক দিক এবং গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, প্রেসিডেন্ট চাইলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানকে আরও দুর্বল করা সম্ভব।
তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সঙ্গে আলোচনায় কেইন আরও সরাসরি নিজের উদ্বেগ তুলে ধরেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সেখানে তাঁর বক্তব্য ছিল, যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
এই অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সময় কেইন হয়তো তাঁর প্রকৃত উদ্বেগের সবটা তুলে ধরছেন না। প্রেসিডেন্টের সামনে তিনি কতটা দৃঢ়ভাবে সামরিক সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে কেইনের মুখপাত্র জোসেফ হলস্টেড তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও সিআইএও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা অবশ্য কেইনের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি সব সময় প্রেসিডেন্টকে সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য দেন এবং জাতীয় নিরাপত্তায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘সম্পদ’।
যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ
ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য সম্প্রতি নতুন কৌশল মূল্যায়ন শুরু করেছে পেন্টাগন ও সেন্ট্রাল কমান্ড। সিএনএনের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচলিত সামরিক পদ্ধতির বাইরে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে সেন্টকমের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একটি ই-মেইল পাঠিয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাসের বেশি সময় পর এ ধরনের বিকল্প নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হওয়াকে অনেকেই পরিস্থিতি প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছে না—এর একটি নীরব স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখছেন।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান হিসেবে ইরানে হামলা চালানোর বিভিন্ন সামরিক বিকল্প প্রস্তুত করা জেনারেল কেইনের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর এখন নতুন করে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কৌশল খোঁজার বিষয়টি সামনে আসায় ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, কেইন এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন, যা তাঁর অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বড়।
প্রতীকী বিজয়ের পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন
যুদ্ধের সামরিক সীমাবদ্ধতা সামনে আসার পাশাপাশি ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে মার্কিন সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের।
সূত্রগুলোর মতে, জেনারেল কেইন ও অন্য কর্মকর্তারা এমন একটি পথ খুঁজছেন, যার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের নেতিবাচক ফল এড়ানো যাবে, আবার ট্রাম্পও দেশে ফিরে এটিকে নিজের একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
অর্থাৎ যুদ্ধ পুরোপুরি সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে শেষ না হলেও এমন কোনো সমঝোতা তৈরি করা হতে পারে, যেটিকে ট্রাম্প তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের প্রমাণ হিসেবে মার্কিন জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারবেন।
এ ধরনের সমঝোতার সম্ভাব্য সূচনা হতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি চুক্তির মাধ্যমে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধার হলে তা শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তি আনবে না, একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বৃহত্তর সমঝোতার পথও খুলে দিতে পারে।
ফলে ইরান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি যুদ্ধের সমাপ্তির রাজনৈতিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন যদি শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে, তাহলে সামনে আরও বড় হামলার বদলে চাপ, সমঝোতা ও কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ওয়াশিংটনের ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।