
শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিতিশীলতা এবং রাজপথের ঘনঘন আন্দোলন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের শিক্ষা খাত অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। সেই ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে সরকার কাজ করছে। এ অবস্থায় অহেতুক ও ঘনঘন আন্দোলন রাষ্ট্রকে অচল করে দেওয়ার শামিল।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার তাদের জন্যই দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তাই কোনো বিষয়ে আন্দোলনে যাওয়ার আগে তা ভেবেচিন্তে করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন শিক্ষামন্ত্রী।
মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘এডুকেশন ফর অ্যা রোবাস্ট ইকোনমি: স্কিলস, ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যান্ড গ্লোবাল ইকোনমি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই) সেমিনারটির আয়োজন করে।
‘দেশে অতিরাজনীতি শুরু হয়েছে’
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে ‘অতিরাজনীতি’ শুরু হয়েছে। একটি সরকারের বয়স ছয় মাসও পূর্ণ হওয়ার আগেই নানা অজুহাতে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা অহেতুক রাজনীতি ও আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা দেশের উন্নতি চায় না; বরং দেশের অধঃপতন চায়।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এহসানুল হক মিলন বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নিয়েছি তোমাদের জন্য, আমরা কাজ করছি তোমাদের জন্য। ভেবেচিন্তে আন্দোলন করো।’
তবে শিক্ষার্থীদের কোনো দাবি বা প্রশ্ন থাকলে রাজপথে যাওয়ার আগে সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা চাইলে তার কাছে এসে তাদের প্রশ্ন ও সমস্যার কথা জানাতে পারে। তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
একই সঙ্গে অকারণে হইচই করে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোনো বিষয়ে আন্দোলনের প্রয়োজন থাকলে তা যৌক্তিকভাবে করা যেতে পারে; কিন্তু বিনা কারণে আন্দোলন করে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করা কাম্য নয়।
‘২০ বছরে শিক্ষা খাত পেছনের দিকে হেঁটেছে’
দেশের শিক্ষা খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তার ভাষ্য, গত দুই দশকে শিক্ষা খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে পেছনের দিকে হেঁটেছে।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এবার ফলাফলে যে পরিবর্তন বা বিপর্যয় দেখা গেছে, সেটিকে কৃত্রিম কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যেই এবার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এবার এসএসসি পরীক্ষায় ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তার মতে, শুধু পরীক্ষার ফল ভালো দেখানোর জন্য শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে সহজ করে দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছে এবং তারা পরবর্তী শিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল বিবেচনা।
শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের কথা
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে জিডিপির নিট ২ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা খাতের বিদ্যমান কাঠামোগত সংকটও দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
এর মধ্যে শিক্ষক সংকটকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়েও রয়েছে হাজার হাজার শূন্য পদ।
বিগত সরকারের রেখে যাওয়া আইনি জটিলতা ও নিয়োগসংক্রান্ত ব্যাকলগের কারণে এসব পদ পূরণে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে দ্রুত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী।
কর্মসংস্থানহীন বিষয়ে অনিয়ন্ত্রিত অনার্স বন্ধ
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এহসানুল হক মিলন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, সেসব বিষয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নতুন অনার্স কোর্স খোলার প্রবণতা বন্ধ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার মতে, শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ালেই হবে না; শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে কী ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে বিশ্বের মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
অসম্পূর্ণ খসড়া নিয়ে আন্দোলন ‘অনভিপ্রেত’
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে দেওয়ার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যেরও সমালোচনা করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি অসম্পূর্ণ খসড়া ফেসবুক বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, কোনো নীতিমালা বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে খসড়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে তা থেকে অপ্রয়োজনীয় আন্দোলন ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। তাই সরকারি সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত যাচাই না করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া না দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
‘শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে হবে’
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় দেশের বিশাল জনসংখ্যা এখন এক ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত গবেষণা করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণের ওপরও জোর দেন তিনি।
উপাচার্যদের উদ্দেশে তিনি এমন একটি একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়নের আহ্বান জানান, যাতে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে ভর্তি হয়ে নির্ধারিত সময়েই শিক্ষা ও ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেন। অর্থাৎ সেশনজট ও অনিশ্চয়তার কারণে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়—এমন একটি কার্যকর ও সময়নিষ্ঠ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে শুধু বড় জিডিপি অর্জন যথেষ্ট নয়। এর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ, বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
তার মতে, দেশে গত কয়েক দশকে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা সম্প্রসারণের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ একই হারে বাড়েনি। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্বের সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের অনেক তরুণ শিক্ষা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নেই। এ পরিস্থিতি বদলাতে শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিলে হবে না। বরং শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছে, তারা কোন দক্ষতা অর্জন করছে এবং সেই দক্ষতা শ্রমবাজারে কতটা কার্যকর—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করার তাগিদ
অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক পর্যায়ে। তাই শুরুতেই পড়া, লেখা, গণিত ও যুক্তির মতো মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ের এসব মৌলিক দক্ষতা দুর্বল থাকলে পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কিংবা অন্যান্য জটিল ও উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করা শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি একই সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিতভিত্তিক (স্টিম) শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের (টিভেট) মান উন্নয়নের ওপর জোর দেন।
সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় ও সংযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি ও মান্দারিনসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। তার মতে, এতে বাংলাদেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
‘উচ্চশিক্ষার বিস্তার হয়েছে, কিন্তু দেশের জন্য কী করছি?’
জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিমাণগত সম্প্রসারণ ঘটেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি তরুণ বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং পরে সেসব দেশেই কাজ করছেন।
এ অবস্থায় দেশের মেধাবী তরুণদের একটি অংশ দেশের বাইরে স্থায়ীভাবে থেকে গেলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এর কী প্রভাব পড়ছে, সেটিও ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার প্রশ্ন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া তরুণরা যখন অন্য দেশের অর্থনীতি ও সেবাখাতে অবদান রাখছেন, তখন দেশের জন্য তাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়—এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে।
‘বেশি পড়াশোনা করলেই চাকরি মিলছে না’
দেশের চাকরির বাজারের বাস্তবতা তুলে ধরে বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক উল্টো হয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, যত বেশি পড়াশোনা করা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে বেকার থাকার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।
প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশের চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় মৌলিক ও ব্যবহারিক দক্ষতা নেই।
তাই শিক্ষাব্যবস্থায় এমন বিষয় ও প্রশিক্ষণ যুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবন শেষ করার সময় অন্তত চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
তার মতে, শুধু ডিগ্রি অর্জনকে শিক্ষার চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। একজন শিক্ষার্থী যোগাযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহার, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় অন্যান্য দক্ষতা কতটা অর্জন করেছে, সেটিও শিক্ষার সাফল্য পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।
এআই খাতে সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চাকরির বাজারের বাস্তবতা তুলে ধরেন মার্কপলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবিন।
তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে সীমিতসংখ্যক পদের বিপরীতে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ছে। কিন্তু বেসরকারি প্রযুক্তি ও এআই খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তার প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটের চেয়ে প্রকৃত যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। অর্থাৎ কোনো প্রার্থী কতটি সনদ অর্জন করেছেন, তার চেয়ে তিনি বাস্তবে কী করতে পারেন এবং প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় সমস্যা কতটা দক্ষতার সঙ্গে সমাধান করতে পারেন—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শিক্ষাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার তাগিদ
সেমিনারের আলোচনায় সামগ্রিকভাবে বক্তারা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বড় ধরনের ব্যবধানের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাদের মতে, শুধু শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষিত বেকারত্বের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
প্রাথমিক পর্যায় থেকে মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করা, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ভাষা শিক্ষার মান বাড়ানো, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইংরেজির পাশাপাশি অন্যান্য বিদেশি ভাষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।
সেমিনারে সাংবাদিক ফারাবি হাফিজের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিয়োজিত ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুশান ভাইজ, ইউনিসেফ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল করিম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা।
আলোচনার সারকথা ছিল—বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু বেশি শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো বা আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করার লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। বরং একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষে কী শিখছে, তার দক্ষতা শ্রমবাজারে কতটা কার্যকর এবং সেই শিক্ষা দেশের অর্থনীতিতে কীভাবে অবদান রাখছে—ভবিষ্যতের শিক্ষা পরিকল্পনায় এসব প্রশ্নকেই কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে।