
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরের এই বিরোধপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ সফর করেছেন পুতিন। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা কুরিলের দক্ষিণের চারটি দ্বীপের ওপর জাপানের দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্বের দাবি রয়েছে। ফলে পুতিনের সফরকে নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর রাশিয়ার কর্তৃত্ব প্রদর্শনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে টোকিও।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পুতিনের এই সফরকে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্য, রুশ প্রেসিডেন্টের সফর জাপানের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং বিতর্কিত দ্বীপগুলো নিয়ে টোকিওর দীর্ঘদিনের অবস্থানের পরিপন্থী।
অন্যদিকে মস্কো এ সফরকে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না। পুতিন বরং জাপানের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, রাশিয়া জাপানের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং জাপানই রাশিয়ার ভূখণ্ডের ওপর মালিকানা দাবি করছে।
ইতুরুপে পুতিন, পরিদর্শন করলেন কারখানা-হাসপাতাল-স্কুল
গতকাল বৃহস্পতিবার কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণতম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ ইতুরুপ সফর করেন পুতিন। জাপানে দ্বীপটি এতোেরোফু নামে পরিচিত।
রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বীপটিতে পৌঁছে পুতিন স্থানীয় আঞ্চলিক গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি একটি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হাসপাতাল ও স্কুল পরিদর্শন করেন।
সফরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের চারটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। পুতিনের মতো রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের সেখানে সরাসরি উপস্থিতি তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সফর হিসেবে দেখছে না জাপান।
বরং টোকিওর দৃষ্টিতে এটি দ্বীপগুলোর ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণকে আরও দৃশ্যমান করার একটি রাজনৈতিক বার্তা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিরোধ
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিরোধের শিকড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে।
১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের চারটি দ্বীপ দখল করে নেয়। এরপর সেখানকার প্রায় ১৭ হাজার জাপানি বাসিন্দাকে বিতাড়িত করা হয়। সেই সময় থেকেই দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে মস্কো ও টোকিওর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
জাপান দক্ষিণের চারটি দ্বীপকে ‘উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চল’ হিসেবে উল্লেখ করে এবং এগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে।
অন্যদিকে রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দ্বীপগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সেখানে রুশ প্রশাসন কার্যকর রয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার রুশ নাগরিক বসবাস করেন।
এই দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণেই রাশিয়ার কোনো শীর্ষ নেতার দ্বীপগুলোতে সফর জাপানের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
‘জাপানি জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে’
পুতিনের সফরের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাপান।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এই সফর ‘জাপানি জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে’। তাঁর মতে, উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলো নিয়ে জাপানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে পুতিনের সফর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগিও পুতিনের সফরের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বিতর্কিত দ্বীপগুলো ঐতিহাসিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে জাপানের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ ঘটনায় জাপান আরও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুতিনের সফরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে জাপানে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে।
পুতিনের পাল্টা বক্তব্য
টোকিওর প্রতিবাদকে গুরুত্ব না দিয়ে পুতিন বরং জাপানের ভূখণ্ডগত দাবির সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, জাপান রাশিয়াকে তাদের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে তাঁর মতে, রাশিয়া জাপানের জন্য কোনো হুমকি নয়।
পুতিনের বক্তব্যের মূল যুক্তি হলো—রাশিয়া জাপানের ভূখণ্ডের ওপর কোনো দাবি করছে না; বরং জাপানই রাশিয়ার ভূখণ্ডের ওপর মালিকানা দাবি করে আসছে।
এর মধ্য দিয়ে মস্কো স্পষ্ট করে দিয়েছে, কুরিল দ্বীপপুঞ্জের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাপানের আপত্তিকে তারা গ্রহণ করছে না।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপ থেকে জাপানের উত্তরের প্রধান দ্বীপ হোক্কাইডো পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘ আগ্নেয় দ্বীপমালা।
দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রে থাকা চারটি দ্বীপ হলো—কুনাশির, হাবোমাই, শিকোতান ও ইতুরুপ। জাপানে এগুলো কুনাশিরি, হাবোমাই, শিকোতান ও এতোেরোফু নামে পরিচিত।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দ্বীপগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এগুলো রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এ ছাড়া দ্বীপগুলোতে সোনা, রুপাসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে। আশপাশের সমুদ্রও সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদের জন্য পরিচিত।
অর্থাৎ, দ্বীপগুলোর গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক বা জাতীয়তাবাদী আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও জড়িত।
যুদ্ধের পর রাশিয়া-জাপান সম্পর্ক আরও খারাপ
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কো ও টোকিওর সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে।
জাপান জি-৭-এর অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে সমন্বয় করে রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে।
রাশিয়ার দৃষ্টিতে জাপানের এই অবস্থান দুই দেশের পুরোনো ভূখণ্ডগত বিরোধকে আরও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে।
ফলে কুরিল দ্বীপপুঞ্জে পুতিনের সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আগের চেয়ে গভীর।
সামরিক বার্তাও কি ছিল?
পুতিন কুরিল সফরের আগে বুধবার রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলের সাখালিন দ্বীপ সফর করেন। সেখানে রুশ নৌবাহিনীর সামরিক মহড়া চলছিল।
রুশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাখালিনে পুতিন রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে একটি বৈঠকে অংশ নেন।
এরপর তিনি কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিতর্কিত এলাকায় যান।
সাখালিনে সামরিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক এবং পরদিন কুরিলের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ সফরের এই ধারাবাহিকতা রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের সঙ্গে সফরটির একটি সম্ভাব্য যোগসূত্রের দিকও সামনে এনেছে।
তবে পুতিনের সফরকে সরাসরি কোনো সামরিক উসকানি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বরং রাশিয়ার পক্ষ থেকে এটিকে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড ও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শনের অংশ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
কুরিল নিয়ে বিরোধের ভবিষ্যৎ কী
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাশিয়া ও জাপানের বিরোধ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এই বিরোধের কারণে দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির পথও দীর্ঘদিন জটিল হয়ে আছে।
পুতিনের সাম্প্রতিক সফর সেই পুরোনো বিরোধকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। একদিকে রাশিয়া দ্বীপগুলোতে নিজের প্রশাসনিক ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে; অন্যদিকে জাপান এখনো দক্ষিণের চারটি দ্বীপকে নিজেদের ‘উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চল’ হিসেবে দাবি করে আসছে।
এ পরিস্থিতিতে পুতিনের সফর টোকিওর কাছে শুধু একটি কূটনৈতিক অস্বস্তির বিষয় নয়, বরং নিজেদের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত দাবির ওপর রাশিয়ার প্রকাশ্য অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার পদক্ষেপ।
ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক বিরোধ এবং পূর্ব এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার মধ্যে কুরিল দ্বীপপুঞ্জের পুরোনো ভূখণ্ডগত বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, পুতিনের ইতুরুপ সফর রাশিয়ার কাছে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি প্রদর্শনের একটি বার্তা হলেও জাপানের কাছে এটি তাদের দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আর এই দুই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিরোধের দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে উঠল।