
আল–জাজিরা
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের একমাত্র ও শেষ খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর তাইবেহ। একসময় শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জনপদ হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক এই শহর এখন ভয়, অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, জমি দখল, কৃষিজমি ও পানির উৎসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ক্রমেই বেড়েছে।
শহরটির খ্রিষ্টান বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, শুধু তাঁদের সম্পদ বা ব্যবসা নয়, তাইবেহে টিকে থাকার অধিকারও যেন ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কেউ কেউ শহর ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসায় ধস নেমেছে। আর যারা এখনো রয়ে গেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ প্রতিদিনের জীবনযাপন করছেন হামলার আশঙ্কা নিয়ে।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের ঐতিহাসিক ভূমি ছেড়ে যেতে নারাজ শহরের অনেক বাসিন্দা।
২০ বছরের বিনিয়োগ, শেষ পর্যন্ত ব্যবসা ছাড়তে হলো
তাইবেহের বাসিন্দা রোলান্ড বাসির প্রায় দুই দশক ধরে শহরের প্রান্তে একটি পাথরখনি ও কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। ব্যবসাটিতে তিনি প্রায় ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন।
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হয়েছে।
রোলান্ডের অভিজ্ঞতা তাইবেহের অনেক বাসিন্দার বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁদের কৃষিজমি, জলপাইবাগান এবং পানির কূপও ধীরে ধীরে দখল করা হচ্ছে।
জমি হারানোর পাশাপাশি পানির উৎসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো স্থানীয় কৃষি ও ব্যবসার ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে নিরাপত্তার সংকটের সঙ্গে অর্থনৈতিক টিকে থাকার প্রশ্নটিও ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠছে।
রাতে ঘুমাতেও ভয়, শিশুর খেলাধুলাও বন্ধ
তাইবেহের বাসিন্দাদের জীবনে নিরাপত্তাহীনতা কতটা গভীর হয়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় রোলান্ড বাসির পরিবারের দৈনন্দিন জীবন থেকে।
রোলান্ডের স্ত্রী সান্দ্রা বাসির আত্মরক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে বাড়িতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখেন। রাতে ঘুমানোর আগে দরজা ঠিকভাবে বন্ধ হয়েছে কি না, তা বারবার পরীক্ষা করেন। বাড়ির নিরাপত্তার জন্য কুকুরও রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে তাঁদের সাত বছর বয়সী ছেলের ওপর। হামলার আশঙ্কায় শিশুটির বাইরে গিয়ে খেলাধুলা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ যে শহর একসময় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ বসবাস ও পর্যটনের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী ব্রুয়ারিও টিকে থাকার লড়াইয়ে
তাইবেহের অর্থনৈতিক সংকটের আরেকটি উদাহরণ ঐতিহ্যবাহী তাইবেহ ব্রুয়ারি। শহরের পরিচিত এই বিয়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটিও বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাদিস খৌরি জানান, তাঁদের আয় আগের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।
তাঁর অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীরা তাঁদের পানির প্রধান উৎস ‘আইন সামিয়া’ ঝরনা এবং ব্যক্তিগত খামার দখল করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে থাকা ‘এলাকা বি’-তেও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা নতুন নতুন ফাঁড়ি স্থাপন করে জমি দখলের চেষ্টা করছে।
এর ফলে শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিই নয়, কৃষি, পানি ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ছে।
সেনাবাহিনীর ঘোষণা, তবু থামেনি হামলার অভিযোগ
বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ঠেকাতে গত ৯ আগস্ট ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাইবেহকে ‘সামরিক অভিযানের আওতাধীন এলাকা’ ঘোষণা করে।
কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এতে পরিস্থিতির কোনো বাস্তব উন্নতি হয়নি। বরং তাঁদের অভিযোগ, শহরটি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তাঁরা বলছেন, সামরিক ঘোষণা থাকলেও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও জমি দখলের কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও তাঁরা কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মধ্যে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকার পরও যদি হামলা ও দখল অব্যাহত থাকে, তাহলে তাঁরা কোথায় নিরাপদ থাকবেন?
দুই বছরে অন্তত ১৫ পরিবার শহর ছেড়েছে
নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও তাইবেহের জনসংখ্যার ওপর প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে অন্তত ১৫টি পরিবার শহর ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে। কেউ নিরাপত্তার কারণে, কেউ আবার ব্যবসা ও জীবিকার সংকটে দেশ ছাড়ছেন।
শহরের পর্যটন খাতও কার্যত বিপর্যস্ত। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেছে। পর্যটননির্ভর ব্যবসা, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও এর প্রভাব অনুভব করছে।
একটি ছোট শহরের ক্ষেত্রে কয়েকটি পরিবার চলে যাওয়া হয়তো সংখ্যাগতভাবে বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু তাইবেহের মতো একটি ছোট ও ঐতিহাসিক খ্রিষ্টান জনপদের জন্য এই প্রবণতা জনসংখ্যাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করছে।
শুধু জমি নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
তাইবেহের পরিস্থিতিকে স্থানীয় বাসিন্দারা কেবল জমি বা ব্যবসা রক্ষার সংকট হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের কাছে এটি নিজেদের সম্প্রদায় ও ঐতিহাসিক উপস্থিতি ধরে রাখার লড়াই।
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরেই কমছে। অভিবাসন, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দখলদারিত্বের প্রভাবের কারণে অনেক খ্রিষ্টান পরিবার পশ্চিম তীর ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছে।
তাইবেহে এই প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হলে শহরটির ঐতিহাসিক খ্রিষ্টান চরিত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শহরের বাসিন্দারা মনে করেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে নিরাপত্তা, জীবিকা ও জমি রক্ষা করে নিজেদের ঐতিহাসিক আবাসভূমিতে টিকে থাকা যায়।
‘আমরা এ জায়গা ছেড়ে যাব না’
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাইবেহের অনেক বাসিন্দা শহর ছেড়ে যেতে রাজি নন।
তাইবেহের মেয়র সুলেইমান খৌরিয়াহ বলেন, তাঁদের পরিবার ও সম্প্রদায়ের এই শহরের সঙ্গে সম্পর্ক বহু পুরোনো। তাঁর ভাষায়, যিশুখ্রিষ্ট এই শহরের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত এবং তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের শহর। আমরা এ জায়গা ছেড়ে যাব না। আমাদের মৃত্যু হলেও আমরা এখানেই সমাহিত হব। কারণ, এটি পবিত্র ভূমি।’
এই বক্তব্য তাইবেহের বর্তমান সংকটের মধ্যে স্থানীয় খ্রিষ্টানদের মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন। একদিকে জমি হারানোর আশঙ্কা, হামলা, অর্থনৈতিক সংকট ও অভিবাসনের চাপ; অন্যদিকে নিজেদের শিকড় ও ঐতিহাসিক পরিচয় ধরে রাখার দৃঢ়তা।
ফলে পশ্চিম তীরের এই ছোট শহরটির সংকট এখন শুধু একটি স্থানীয় নিরাপত্তা বা জমি-সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একই সঙ্গে ভূমি, নিরাপত্তা, জীবিকা, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং একটি প্রাচীন সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।