
জুলাই বিপ্লবে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ নিয়ে কোনো ধরনের ‘ছেলেখেলা’ করতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, দেশে ফ্যাসিস্টদের বিচার হবেই। তবে সেই বিচার কোনো গোপন প্রক্রিয়ায় নয়, উপযুক্ত আদালতে ন্যায়সংগতভাবে করা হবে। এমনভাবে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে, যাতে এর স্বচ্ছতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকে।
রোববার দুপুরে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জেলা আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ যে পরিবর্তন এনেছেন, তার পেছনে রয়েছে বিপুল আত্মত্যাগ। এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে কোনোভাবেই আবার এমন কোনো শক্তির হাতে তুলে দেওয়া যাবে না, যারা অতীতে মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রতিটি হত্যার বিচার হবে
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার সব বাধা অতিক্রম করে বিচারের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের আন্দোলন ও জুলাই বিপ্লবে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘চব্বিশের মানুষ আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন, যা পেতে আমাদের ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হারাতে হয়েছে। ৩০ হাজারের বেশি সাহসী তরুণ পঙ্গু হয়েছেন।’
তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত দেশ নিয়ে কোনো ধরনের ছেলেখেলা করা যাবে না। একই সঙ্গে ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার কোনো পথও তৈরি করা হবে না।
আসাদুজ্জামান বলেন, দেশে ফ্যাসিস্টদের বিচার হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং প্রতিটি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হবে।
তবে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো বা গোপনীয়তার পথ অনুসরণ করা হবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেই বিচার সম্পন্ন করা হবে।
‘গোপন বিচার নয়, ন্যায়বিচার হবে’
আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া গোপনে পরিচালিত হবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারের হাতে শক্ত প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে সলিড এভিডেন্স আছে। আপনারা ধৈর্য ধরুন।’
বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা হবে। ফলে বিচার নিয়ে কেউ যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তুলতে না পারে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকার এগোচ্ছে।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার একদিকে জুলাই আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে বিচারপ্রক্রিয়াকে আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে আগের আন্দোলনের যোগসূত্র
আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবকে দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করেন।
তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যে মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন, গত ১৭ বছর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে রাজপথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই বিপ্লবেও মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে তিনি ওই সময়ে বিএনপি ও এর নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগও পুনরায় উল্লেখ করেন।
‘৬০ লাখের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা’
বিএনপি করার কারণে ৬০ লাখের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও গায়েবি’ মামলা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব মামলায় এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছিল, যাঁরা মামলা হওয়ার অনেক আগে, এমনকি ২০ বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন।
বিএনপির আন্দোলনের সময় প্রাণহানি ও গুমের অভিযোগ তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, স্বৈরাচার হাসিনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময়ে তাঁদের সাড়ে চার হাজার সহযোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তাঁদের অনেককে ‘ক্রসফায়ারের’ নামে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া ৭০০-এর বেশি সহযোদ্ধাকে গুম করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন আইনমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যে এসব অভিযোগের বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টিও বর্তমান সরকারের বিচারিক কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উঠে আসে।
সরকারপ্রধানের প্রতি আস্থার আহ্বান
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী সরকারপ্রধান তারেক রহমানের প্রতি আস্থা ও ভরসা রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটের কালি শুকানোর আগেই ফ্যামিলি কার্ড মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক কার্ড বিতরণও শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তবে সরকার সেই সংকট মোকাবিলায় সমাধানের পথ খুঁজছে বলে জানান তিনি।
‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে দেশে আইনের সংকট তৈরি হয়েছিল এবং তখন আইনের শাসন বলে কিছু ছিল না।
তাঁর মতে, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশে আইনের শাসন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইন ও বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আইনজীবী সমিতির নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর
বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। আইনমন্ত্রী ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
নতুন ভবনকে কেন্দ্র করে জেলা আইনজীবীদের পেশাগত কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। আইনজীবীদের পেশাগত পরিবেশ উন্নত হলে বিচারপ্রার্থীদেরও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ (ইমন)।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলী হায়দার বাবুল, আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিনসহ জেলা আইনজীবী সমিতির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
বিচারের পাশাপাশি আইনের শাসনের বার্তা
বরিশালের অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায়সংগত ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অভিযুক্তদের বিচার করা হবে, তবে কোনো গোপন বিচার হবে না। উপযুক্ত আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে বিচার নিয়ে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন না ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেন।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর দাবি, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে অপরাধের বিচার হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাও অক্ষুণ্ন থাকবে।