
কুষ্টিয়ায় গণ অধিকার পরিষদের এক কর্মীর পায়ের দুই রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় সংগঠনটির আরও কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে গণ অধিকার পরিষদ। হামলায় এক নেতার নাকের হাড় ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি কপালের হাড় ফেটে গেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
রোববার রাতে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার নেতারা। সংগঠনের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন।
তবে হামলার এসব অভিযোগের বিষয়ে জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমাবেশের শেষ মুহূর্তে হামলার অভিযোগ
তৌকির আহমেদ বলেন, শনিবার বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে গণ অধিকার পরিষদের পূর্বঘোষিত একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সমাবেশের সমাপনী বক্তব্য চলার সময় সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, সমাবেশের শেষ মুহূর্তে সংসদ সদস্য আমির হামজা এবং আশপাশে থাকা জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা সেখানে এসে তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান।
গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা তখন হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন বলে জানান তৌকির। এ সময় তাঁদের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী মারধরের শিকার হন এবং অনেকে আহত হন বলে দাবি করেন তিনি।
তৌকির আহমেদ বলেন, হামলার একপর্যায়ে তাঁদের একজন কর্মীর পায়ের দুইটি রগ কেটে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। একই হামলায় তাঁদের আরেক নেতার নাকের হাড় ভেঙে যায় এবং কপালের হাড় ফেটে যায় বলেও জানান তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় গণ অধিকার পরিষদের আরও বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে তৌকির আহমেদ অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা কুষ্টিয়া জেলা গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা চালিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল, নগদ টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য ভাঙচুর করা হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরেই নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সংগঠনের নেতার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
আমির হামজাকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে তৌকির আহমেদ সংসদ সদস্য আমির হামজার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, শনিবার বিকেল থেকেই ছয় রাস্তার মোড়ে আমির হামজার বিরুদ্ধে গণ অধিকার পরিষদের সমাবেশ চলছিল।
তৌকির বলেন, সমাবেশের সামনে দিয়ে আমির হামজা গাড়িতে করে কেন তাঁর বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, তা তাঁদের কাছে বোধগম্য নয়। তাঁর দাবি, আমির হামজা সমাবেশস্থলের কাছে এসে গাড়ি থামান। অন্য পথ দিয়েও তিনি বাড়িতে যেতে পারতেন বলে মন্তব্য করেন তৌকির।
এ ঘটনাকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, সেখানে আমির হামজার ‘দুরভিসন্ধি’ ছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য আমির হামজার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
‘ইট দিয়ে প্রথম আঘাত’ নিয়ে চ্যালেঞ্জ
হামলার ঘটনায় কে আগে আঘাত করেছে, তা নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কথা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তৌকির আহমেদ।
তিনি দাবি করেন, আমির হামজা বলেছেন, গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকেই নাকি প্রথমে ইট দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
এর জবাবে তৌকির বলেন, আমির হামজা যদি এমন কোনো ছবি বা ভিডিও দেখাতে পারেন, যেখানে দেখা যাবে তিনি ইট দিয়ে প্রথম আঘাত করেছেন, তাহলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেবেন।
অন্যদিকে, এমন কোনো ছবি বা ভিডিও দেখাতে না পারলে আমির হামজাকেই তাঁর ভাষায় ‘নাকে খত’ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গণ অধিকার পরিষদ হামলার দায় নিজেদের ওপর আসার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, তারাই প্রথম হামলার শিকার হয়েছে।
আহতদের কয়েকজন ঢাকায় চিকিৎসাধীন
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হামলায় আহত গণ অধিকার পরিষদের কয়েকজন নেতা-কর্মী বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গুরুতর আহত কর্মীর পায়ের দুই রগ কেটে যাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি আরও কয়েকজনের আঘাতের কথা তুলে ধরে সংগঠনটি হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে থানায় একটি এজাহার জমা দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তবে এজাহারে কার কার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং পুলিশ এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে হামলার অভিযোগ
কুষ্টিয়ার ছয় রাস্তার মোড়ের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে গণ অধিকার পরিষদ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে, অন্যদিকে হামলার সূত্রপাত ও ঘটনার দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।
গণ অধিকার পরিষদের নেতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে হামলায় রূপ নেয়। এরপর একাধিক নেতা-কর্মী আহত হন এবং সংগঠনের এক নেতার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নেতারা
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গণ অধিকার পরিষদের খুলনা বিভাগীয় মুখ্য সমন্বয়ক শাকিল আহমেদ (তিয়াস), জেলা গণ অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদুল ইসলাম, ছাত্র পরিষদের সভাপতি বিপ্লব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সাকিবুল হাসান, সদর উপজেলা সভাপতি রয়েল, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক রুমন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
তাঁরা হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
গণ অধিকার পরিষদের নেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কোনো সংগঠনের নেতা-কর্মীর ওপর হামলা বা তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে গুরুতর আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
ঘটনাটি নিয়ে এখন পর্যন্ত মূলত গণ অধিকার পরিষদের পক্ষের বক্তব্যই পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি অভিযুক্ত জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী এবং সংসদ সদস্য আমির হামজার বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।