
বিবিসি
রাশিয়ার ভূখণ্ডে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রোববার রাতে চালানো এই হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন বলে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এক রাতে ৮২২টি ড্রোন দিয়ে চালানো এ হামলা চলতি বছরে রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা।
রাশিয়ার আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার বড় একটি অংশের লক্ষ্য ছিল রাজধানী মস্কো। শুধু মস্কোমুখী প্রায় ৬০০টি ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করার দাবি করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। হামলায় রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আগুন ধরে গেছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ভেতরে ড্রোন হামলা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সামরিক রসদ সরবরাহ ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করছে কিয়েভ।
অন্যদিকে একই সময়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলেও ব্যাপক রুশ হামলা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ৩৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ফলে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধ এখন শুধু সম্মুখসীমায় সীমাবদ্ধ নেই; উভয় পক্ষই ক্রমেই একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে হামলার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মস্কোমুখী ৬০০ ড্রোন
রাশিয়ার কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৮২২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি ড্রোনের লক্ষ্য ছিল মস্কো ও এর আশপাশের এলাকা।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, রাজধানীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে কোলেদিনো এলাকায় রুশ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামে ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন।
হামলার পর গুদামটিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে ভবনটি থেকে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী বের হতে দেখা যায়।
মস্কোর গভর্নর আন্দ্রে ভোরোবিয়ভ জানিয়েছেন, হামলায় ৮৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
রুশ কর্মকর্তারা বলছেন, মস্কোর ওপর সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তীব্র ড্রোন হামলাগুলোর একটি ছিল এটি। হামলার কারণে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং বিমান চলাচলেও প্রভাব পড়ে।
রোস্তভ ও বেলগোরোদেও হতাহতের ঘটনা
শুধু মস্কো নয়, ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, রাতের হামলায় সেখানে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাত্রীবাহী একটি বাসে হামলার ঘটনায় এক নারী নিহত হয়েছেন।
এ নিয়ে রুশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় ইউক্রেনের সর্বশেষ ড্রোন হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
তবে এসব হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ওয়াইল্ডবেরিজ কেন লক্ষ্যবস্তু?
রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ওয়াইল্ডবেরিজ। প্রতিষ্ঠানটির গুদাম ও সরবরাহকেন্দ্রগুলো গত জুলাই থেকেই একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার নাগরিকেরা সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও পরিবহনের ক্ষেত্রে যেসব সরবরাহ ও লজিস্টিক কেন্দ্র ব্যবহার করেন, সেগুলোর কিছু অংশকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
এর উদ্দেশ্য রুশ সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানো।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, সর্বশেষ হামলায় ওয়াইল্ডবেরিজের ১০টি বড় পণ্য পরিবহন ও সরবরাহকেন্দ্রের মধ্যে সাতটি অচল হয়ে পড়েছে।
তবে এসব স্থাপনার সঙ্গে রুশ সামরিক সরবরাহের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পাল্টা হামলায় ইউক্রেনেও নিহত ৭
রাশিয়ার ভূখণ্ডে বড় ড্রোন হামলার একই সময়ে ইউক্রেনেও ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রুশ হামলায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত সাতজন নিহত এবং ৩৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে একটি আবাসিক ভবনে রুশ বোমা হামলায় ৬৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ও ৬৪ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের ক্রিভি রিহ শহরেও রুশ হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া সুমি, দোনেৎস্ক ও খেরসন অঞ্চলে একজন করে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সুমি অঞ্চলে ড্রোন হামলায় ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এসব হামলায় বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষের হতাহতের কথা তুলে ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।
কিয়েভে একাধিকবার সাইরেন
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও রুশ হামলার সময় একাধিকবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, হামলায় এক শিশুসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় জরুরি পরিষেবাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ চালিয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। এর জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার গভীরে ড্রোন হামলা আরও জোরদার করেছে।
এভাবে যুদ্ধের একটি নতুন বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দুই পক্ষই এখন সামনের সারির যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডের অনেক গভীরে হামলা চালাতে সক্ষম এমন অস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে।
রাশিয়ার পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বইয়ের বাজার
রাশিয়ার হামলার প্রভাব পড়েছে কিয়েভের পোচাইনা এলাকার একটি বইয়ের বাজারেও।
হামলার পর বাজারের মেঝেতে পোড়া বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
বাজারটির একটি বইয়ের দোকান ছিল ৬৯ বছর বয়সী ভ্যালেন্তিনার স্বামীর। হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি ছড়িয়ে থাকা বইগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের স্বামীর দোকানের বই শনাক্ত করেন।
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাস্তায় পড়ে থাকা বইগুলো তাঁর স্বামীর স্টলের এবং তিনি সেগুলো দেখেই চিনতে পেরেছেন।
তাঁর কথায়, মানুষ কখনো ভাবতে পারে না যে এমন বিপর্যয় একদিন নিজের জীবনেও এসে পড়তে পারে।
বইয়ের বাজারের এই ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার ওপর সংঘাতের প্রভাবের একটি চিত্র তুলে ধরেছে।
‘ফ্ল্যামিঙ্গো’ ক্ষেপণাস্ত্রের কারখানায় হামলার দাবি রাশিয়ার
রাশিয়া জানিয়েছে, এর আগের রাতে তারা ইউক্রেনের সামরিক অবকাঠামোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, ইউক্রেনের ‘ফ্ল্যামিঙ্গো’ ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির একটি কারখানা এবং ড্রোনের যন্ত্রাংশ তৈরির আরেকটি কারখানা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এসব স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
তবে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং লক্ষ্যবস্তুগুলোর সামরিক গুরুত্ব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ করে আসছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই আবাসিক ভবন, বিদ্যুৎব্যবস্থা, পরিবহনকেন্দ্র, গুদাম, বাজার ও অন্যান্য অবকাঠামো হামলার শিকার হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের ১৩টি অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়া তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে থাকা যেকোনো বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
রাশিয়া অবশ্য তাদের হামলাকে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের অভিযান হিসেবে তুলে ধরে এবং বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে।
একইভাবে ইউক্রেনও দাবি করে, রাশিয়ার সামরিক রসদ ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে দুর্বল করার জন্য তাদের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।
যুদ্ধের নতুন পর্যায়
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধের চরিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সম্মুখসীমায় লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশই দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালাচ্ছে।
রাশিয়ার জন্য মস্কোর মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বড় আকারের ড্রোন হামলা নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের জন্য রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিনিয়ত বেসামরিক মানুষের জীবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
৮২২টি ড্রোনের হামলা এবং তার পাল্টা হিসেবে ইউক্রেনে রুশ হামলা—দুই ঘটনাই দেখাচ্ছে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আরও গভীর ও বিস্তৃত এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা, শিল্পকারখানা ও শহরাঞ্চল ক্রমেই হামলার আওতায় আসায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।