
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিগগিরই পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। উচ্চশিক্ষায় গবেষণার পরিধি বাড়ানো, আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞানচর্চা জোরদার করা এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার ঢাকার শেরাটন হোটেলে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) উদ্যোগে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, কেন এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর অনুমতি দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে ‘ক্রস-বর্ডার এডুকেশন’ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণাকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পিএইচডি চালু হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তিনি আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তার মতে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান শক্তিশালী করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনো অনেক পিছিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক পরিবেশ উন্নত করা গেলে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিকীকরণকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের পারস্পরিক পার্থক্য ভুলে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ইউজিসি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ, বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া এবং গবেষণার মান বাড়ানোর বিষয়গুলোকে ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
‘বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ জরুরি’
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং সংস্থা কিউএস (কোয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস) আয়োজিত এ ফোরামে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)।
ফোরামের প্রতিপাদ্য ছিল—‘বেঞ্চমার্ক বাংলাদেশ: বিল্ডিং ওয়ার্ল্ড-ক্লাস ইউনিভার্সিটিজ থ্রু গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডস’। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার সঙ্গে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে ফোরামে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে কিউএসের শীর্ষ প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংস্থাটির ভাইস প্রেসিডেন্ট (স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল এনগেজমেন্ট) অশ্বিন ফার্নান্দেজ, চিফ কমার্শিয়াল অফিসার জেসন নিউম্যান এবং আঞ্চলিক অংশীদারত্ববিষয়ক পরিচালক রামি আওয়াদ।
তাঁদের বক্তব্যে কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের বিভিন্ন সূচক, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান উন্নত করার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিকীকরণে নতুন সম্ভাবনা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর উদ্যোগের বিষয়টি উচ্চশিক্ষার গবেষণা কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দেশে গবেষণার সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা গেলে দেশেই উচ্চতর গবেষণার সুযোগ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালী হলে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, যৌথ প্রকাশনা এবং বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে পিএইচডি চালুর ক্ষেত্রে গবেষণার মান, যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত গবেষণা অবকাঠামো, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা ও মানদণ্ড যাচাই করে এ ধরনের প্রোগ্রাম চালুর অনুমোদন দেওয়া হলে উচ্চশিক্ষায় এর ইতিবাচক প্রভাব আরও কার্যকরভাবে পাওয়া সম্ভব হবে।
এআই যুগে ভবিষ্যৎ দক্ষতার ওপর গুরুত্ব
ফোরামের উদ্বোধনী পর্বের পর ‘কিউএস র্যাঙ্কিংস মেথোডলজি’ এবং ‘কিউএস র্যাঙ্কিংস ২০২৮ সাইকেল’ বিষয়ে দুটি পৃথক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সেশনে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের বিভিন্ন সূচক, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এরপর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের অংশগ্রহণে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর একটি ছিল ‘ফ্রম ক্যাম্পাস টু ক্যাপাবিলিটি: ক্লোজিং বাংলাদেশ’স ফিউচার স্কিলস গ্যাপ ইন দ্য এআই এরা’ এবং অন্যটি ‘একসিলারেটিং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ইন হায়ার এডুকেশন’।
প্যানেল আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের যুগে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতা কীভাবে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে মতবিনিময় হয়। একই সঙ্গে শিল্প খাতের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমের সমন্বয় এবং উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় উঠে আসে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মবাজারে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পভিত্তিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়।
সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
এ ফোরামে স্বাগত বক্তব্য দেন এআইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও এপিইউবির সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আবেদীন। আরও বক্তব্য দেন এপিইউবির সভাপতি মো. সবুর খান। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এআইইউবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চেয়ারম্যান নাদিয়া আনোয়ার।
সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ বক্তব্য দেন এআইইউবির সাবেক উপাচার্য, একাডেমিক উপদেষ্টা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কারমেন জিটা লামাগনা।
ফোরামে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, ইউজিসির সদস্য, নীতিনির্ধারক, সরকারি প্রতিনিধি, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পুরো আয়োজনের আলোচনায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে গবেষণা, পিএইচডি শিক্ষা, আন্তর্জাতিকীকরণ, বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং, বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ, এআই এবং ডিজিটাল রূপান্তরকে ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণাও সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনুমোদিত হলে এ উদ্যোগ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গবেষণার মান, শিক্ষক দক্ষতা, অবকাঠামো, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।