
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামপন্থী দল ও সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ না নিলে অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও কমিশননির্ভর ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমিরের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আয়োজিত ‘তৃণমূলের প্রার্থী বাছাই কমিটি’র এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মামুনুল হক বলেন, জনগণের কল্যাণ ও দেশের স্বার্থে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সবার আগে নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে আসতে হবে। ইসলামপন্থী ও সৎ রাজনৈতিক কর্মীরা যদি নির্বাচন থেকে দূরে থাকেন, তাহলে সেই শূন্যতা অসৎ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা পূরণ করার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি নীরবে বসে থাকি, একজন সৎ মানুষ যদি এগিয়ে না আসেন, তাহলে একজন কমিশনখোর চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ পাবে। একজন সৎ মানুষ যদি এগিয়ে না আসেন, তাহলে একজন দুর্নীতিবাজ পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। একজন চাঁদাবাজ সিটি মেয়র হওয়ার সুযোগ পাবে।’
তাঁর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও নাগরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান
মামুনুল হক বলেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হতে হবে। তিনি মনে করেন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং জনসেবার মানসিকতা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
তিনি ইসলামপন্থীদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকলে জনপ্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো অন্যদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের আস্থা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
অর্থশক্তি ও প্রভাব কমানোর আহ্বান
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অর্থশক্তি ও প্রভাবশালী মহলের আধিপত্য কমাতে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির।
মামুনুল হক অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে অনেক সময় সৎ ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় যথাযথভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পান না।
তাঁর মতে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। অর্থের প্রভাব, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্য কিংবা অন্য কোনো ধরনের চাপ যেন নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীদের ওপর নির্বাচনের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না; নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক রাখার জন্য নির্বাচন কমিশনেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলার তাগিদ
মামুনুল হক শুধু নির্বাচন কমিশনের দিকে তাকিয়ে না থেকে রাজনৈতিক দল ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে তৃণমূল পর্যায় থেকেই সাংগঠনিকভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে যাঁদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে এবং যাঁরা মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজন সম্পর্কে জানেন, তাঁদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব নির্বাচন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, স্থানীয় সরকারে কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে উঠলে নাগরিক সেবা আরও জনমুখী করা সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় সরকারকে জনবান্ধব করার লক্ষ্য
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নাগরিকদের নানা ধরনের সেবা দেওয়া হয় এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়।
মামুনুল হকের বক্তব্যে স্থানীয় সরকারকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, জনপ্রতিনিধিরা যদি সৎ ও জনকল্যাণে নিবেদিত হন, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল জনগণের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব।
এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী বাছাইকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। দলের তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগও সেই প্রক্রিয়ার অংশ বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলের প্রস্তুতি
মামুনুল হকের বক্তব্য আসে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আয়োজিত তৃণমূলের প্রার্থী বাছাই কমিটির সভায়। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক প্রস্তুতির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
দলের পক্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী চিহ্নিত করা এবং তাঁদের যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসম্পৃক্ততা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি দলটির বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
সভায় দলের নেতারা স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেন।
সভায় আরও যারা বক্তব্য দেন
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মাওলানা হাসান জুনাইদের পরিচালনায় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন হোসেন মিয়াজী এবং মাওলানা মুফতি শরাফত হোসেন।
তাঁরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই এবং যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির বিষয়ে বক্তব্য দেন।
স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বার্তা
মামুনুল হকের বক্তব্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দল ও সংগঠনগুলোকে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রার্থী তৈরির কাজ শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে অর্থশক্তি ও প্রভাবশালী মহলের আধিপত্য কমিয়ে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এই উদ্যোগের মাধ্যমে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি ও নির্বাচনী প্রস্তুতি আরও জোরদার করতে চাইছে। তবে শেষ পর্যন্ত কতগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলটি প্রার্থী দেবে এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয় হবে কি না, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে।