
রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় ২৭ কাঠা সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে প্রথম দিনের সাক্ষ্য গ্রহণ পিছিয়ে গেছে। নির্ধারিত দিনে কোনো সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় সাক্ষ্য গ্রহণের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
আজ বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এর বিচারক মো. আব্দুস সালামের আদালতে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করা হয়।
আদালত দুদকের আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের নতুন দিন নির্ধারণ করেন।
সাক্ষী না আসায় সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি
আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. খাদেমুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, কারাগারে থাকা সালাম মুর্শেদীসহ জামিনে থাকা আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়েছিল। তবে কোনো সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় বুধবার মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
মামলার ১৩ আসামির মধ্যে চারজন পলাতক রয়েছেন।
এর আগে গত ৬ জুলাই একই আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নামঞ্জুর করে মামলাটির অভিযোগের বিচার শুরুর আদেশ দেন। সেই আদেশের ধারাবাহিকতায় বুধবার থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর কথা ছিল। তবে সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে তা আর শুরু হয়নি।
মামলায় আসামি যারা
সালাম মুর্শেদী ছাড়াও মামলায় আসামি করা হয়েছে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন খাদেম ও এম আজিজুল হককে। এ ছাড়া রাজউকের সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট) মো. আজহারুল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিব উল্লাহ এবং সাবেক সহকারী সচিব আবদুস সোবহানও মামলার আসামি।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন কক্সবাজারের রামুর বাসিন্দা মীর মোহাম্মদ হাসান ও তাঁর ভাই মীর মো. নুরুল আফছার, রাজউকের সাবেক সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম নুরুল হক, সাবেক পরিচালক (এস্টেট) আবদুর রহমান ভূঁঞা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক শাখা সহকারী মো. মাহবুবুল হক এবং লালমাটিয়ার ইফফাত হক ও তাঁর স্বামী মোহাম্মদ আব্দুল মঈন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আসামিদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত নথিপত্রে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরস্পর যোগসাজশের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে।
যেভাবে মামলার সূত্রপাত
গুলশানের ওই সম্পত্তি নিয়ে অভিযোগের সূত্রপাত হয় উচ্চ আদালতে করা একটি রিটের মাধ্যমে। পরিত্যক্ত সম্পত্তির ‘খ’ তালিকাভুক্ত বাড়িটি দখলে রাখার অভিযোগ ওঠার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।
রিটে দুর্নীতি দমন কমিশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও গণপূর্ত বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।
প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ১ নভেম্বর হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে বাড়িসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র হলফনামা আকারে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে রাজউকের পক্ষ থেকে আদালতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দাখিল করা হয়। বাড়িটি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য দুদককেও নির্দেশ দেন আদালত।
দুদকের মামলা ও পরে সালাম মুর্শেদীকে আসামি করা
অনুসন্ধানের পর রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক ইয়াছির আরাফাত।
তখন মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদীকে আসামি করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলার তদন্তে নতুন তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক মো. আনোয়ারুল হক আদালতে ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এরপর আদালতে অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি ও আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নিয়ে কার্যক্রম চলে। গত ৬ জুলাই আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দেন এবং মামলার অভিযোগের বিচার শুরুর আদেশ দেন।
২৭ কাঠা সম্পত্তি নিয়ে অভিযোগ
দুদকের অভিযোগপত্রে গুলশান আবাসিক এলাকার ওই ২৭ কাঠা জমির মালিকানা ও নথিপত্র নিয়ে বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে গুলশান আবাসিক এলাকার সিইএন (ডি) ২৭ নম্বর, হোল্ডিং নম্বর ২৯, রোড নম্বর ১০৪-এর প্লটটি ‘খ’ তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্লটটির আয়তন ২৭ কাঠা।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত না করেই বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা ও জাল রেকর্ডপত্র তৈরি করেন।
পরবর্তী সময়ে ওই নথিপত্রের ভিত্তিতে হস্তান্তর অনুমতি এবং নামজারি অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
সংস্থাটির দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
তবে আদালতে বিচারাধীন এ মামলায় এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতই অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
সালাম মুর্শেদীর রাজনৈতিক পরিচয়
আব্দুস সালাম মুর্শেদী ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের নভেম্বরে খুলনা-৪ আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে সরকারি সম্পত্তি-সংক্রান্ত মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এখন পরবর্তী শুনানি ২১ সেপ্টেম্বর
বুধবার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু না হওয়ায় মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম আরও এক ধাপ পিছিয়েছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ওই দিন সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হলে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে। সাক্ষ্য গ্রহণের পর আসামিপক্ষের জেরা, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন হবে।
গুলশানের ২৭ কাঠা সরকারি সম্পত্তি নিয়ে করা এই মামলায় অভিযোগের সঙ্গে সরকারি সম্পত্তির মালিকানা, নথিপত্রের বৈধতা, হস্তান্তর ও নামজারি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা—সবকিছুই বিচারিকভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
এখন আদালতের পরবর্তী নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীরা উপস্থিত হন কি না এবং মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।