
দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে লোডশেডিংয়ে। বুধবার বিকেলের পর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও ভাগ ভাগ করে লোডশেডিং দিতে হয়েছে।
এলএনজি কার্গো না থাকায় বুধবার বেলা তিনটার দিকে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ আরও কমে যায়। সন্ধ্যার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও গ্যাসের জোগান কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়।
ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চলেও লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
এলএনজি কার্গো না আসায় বুধবার বিকেল নাগাদ এক্সিলারেটের টার্মিনালে মজুত থাকা গ্যাস পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। এরপর ওই টার্মিনাল থেকে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন এলএনজি কার্গো না আসা পর্যন্ত এখন মূলত সামিটের ভাসমান টার্মিনালের ওপরই আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার হিসাব বলছে, বুধবার দুপুর ১২টায় দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে প্রায় ৬৬ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল। এর সঙ্গে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া ১৬২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যোগ হয়ে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২২৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।
ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে পরিস্থিতি বদলে যায়। সন্ধ্যা ৬টায় এলএনজি সরবরাহ কমে ৫৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে নেমে আসে। দেশীয় উৎসের সরবরাহও সামান্য কমে হয় ১৬২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। সব মিলিয়ে তখন জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।
সরকারি হিসাবে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় সরবরাহ ছিল মাত্র ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।
অর্থাৎ ওই সময় চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ১৬১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও দেশে গড়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
গ্যাসের এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। তখন উৎপাদন ও সরবরাহ ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ১১৭ মেগাওয়াট।
দুপুর ২টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ১৫ হাজার ২০৬ মেগাওয়াট হয়। কিন্তু সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ১৩৯ মেগাওয়াট। এতে ঘাটতি বা লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৭ মেগাওয়াটে।
বিকেল ৫টায় চাহিদা আরও বেড়ে ১৫ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট হলে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ফলে তখন লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াট।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাত ৭টায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। বিপরীতে সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং বেড়ে হয় ২ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট।
রাত ৯টাতেও প্রায় ২ হাজার ৪৪৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
দিনের শুরুতে যখন লোডশেডিং প্রায় ছিল না, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সন্ধ্যার পর তা আড়াই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়াই এর অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং নতুন এলএনজি কার্গো দ্রুত না এলে বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।