
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বদলে দিচ্ছে উচ্চশিক্ষার ধরন। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকে গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ থেকে অ্যাসাইনমেন্ট—বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে এবার বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (এনইউএস)।
এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সুযোগ চালু করছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সব নবীন স্নাতক শিক্ষার্থীর জন্য জেনারেটিভ এআই বিষয়ে একটি মৌলিক কোর্স সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গত ১১ আগস্ট ওপেনএআইয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়ে এনইউএস এ উদ্যোগের কথা জানায়। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান কোয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডসের (কিউএস) ২০২৭ সালের বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এনইউএস। ফলে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এআই দক্ষতাকে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব নবীন শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক এআই কোর্স
এনইউএসের নতুন উদ্যোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, জেনারেটিভ এআই শেখা কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের সব স্নাতক শিক্ষার্থীকে ‘THE1008 Applied Generative AI: From Prompting to Evaluation’ নামের একটি কোর্স সম্পন্ন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Transition to Higher Education’ (T.H.E.) কর্মসূচির আওতায় কোর্সটি চালু করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের এআই প্রযুক্তির মৌলিক ধারণা ও ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
কোর্সটির লক্ষ্য শুধু চ্যাটবটকে প্রশ্ন করে উত্তর নেওয়া শেখানো নয়। বরং জেনারেটিভ এআই কীভাবে কাজ করে, কীভাবে বড় ভাষা মডেল বা এলএলএম ব্যবহার করতে হয় এবং বিভিন্ন মাল্টিমোডাল এআই টুল কীভাবে কাজে লাগানো যায়—এসব বিষয়ও শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে।
এর পাশাপাশি এআইয়ের দেওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটি যাচাই করার কৌশলও কোর্সটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এআই দ্রুত তথ্য তৈরি করতে পারলেও তার প্রতিটি উত্তর সঠিক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্য যাচাই ও বিচার করার সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
শুধু এআই ব্যবহার নয়, সঠিকভাবে ব্যবহার শেখানো
এনইউএসের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কেবল নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে তৈরি করা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় চায়, শিক্ষার্থীরা এআইকে তথ্য বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীল কাজের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখুক।
এ জন্য এআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য সরাসরি গ্রহণ করার পরিবর্তে সেটি বিশ্লেষণ, যাচাই ও মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও বিচারবোধও যেন সক্রিয় থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে চাইছে এনইউএস।
বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পুরো শিক্ষাজীবনজুড়েই এআই-সংক্রান্ত দক্ষতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। প্রথম বর্ষের মৌলিক কোর্সের পর তাদের বিভিন্ন একাডেমিক ও পেশাগত কাজে এআই ব্যবহারের আরও সুযোগ তৈরি করা হবে।
চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সুযোগ
নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে এনইউএস শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সুযোগও চালু করছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও একাডেমিক কাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যবহার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
তবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এনইউএস জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কর্মপরিসরে তৈরি করা তথ্য ও কথোপকথন ওপেনএআইয়ের মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হবে না।
এতে শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও একাডেমিক কাজের নিরাপত্তা সম্পর্কেও সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন।
নির্দিষ্ট কোর্সে উন্নত এআই টুলের পরীক্ষামূলক ব্যবহার
শুধু একটি মৌলিক কোর্স চালু করেই থেমে থাকতে চায় না এনইউএস। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, নির্বাচিত কিছু কোর্সে আরও উন্নত এআই টুল পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হবে।
পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এসব টুলের কার্যকারিতা, শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে প্রভাব এবং একাডেমিক কাজে এর ব্যবহারযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর ধীরে ধীরে সফল ও কার্যকর টুলগুলো স্নাতক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ এআইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় একবারে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ না করে ধাপে ধাপে এর ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনইউএস।
এআইয়ের পাশাপাশি মানবিক দক্ষতাতেও গুরুত্ব
এআই যত উন্নত হচ্ছে, ততই শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে—প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কীভাবে ধরে রাখা যাবে?
এনইউএসের উদ্যোগে এই বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের এআই দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তা, বিচারবোধ এবং তথ্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার মতো মানবিক দক্ষতার ওপরও জোর দেওয়া হবে।
কারণ এআই কোনো তথ্য বা উত্তর তৈরি করতে পারলেও সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষেরই।
তাই এনইউএসের লক্ষ্য এআইকে শিক্ষার্থীর চিন্তার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং শিক্ষার্থীর দক্ষতা বাড়ানোর একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা।
বড় পরিসরে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা
এনইউএসের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা তান শুই-মিন বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে এআই ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুধু পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বড় পরিসরে এবং টেকসইভাবে কীভাবে করা যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে একাধিক এআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব করার কথাও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদে কোনো একটি প্রযুক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে কাজ করতে চায় এনইউএস।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের এআই প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে কোন প্রযুক্তি কোন ধরনের একাডেমিক বা পেশাগত কাজে বেশি কার্যকর, সে সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবেন।
উচ্চশিক্ষায় নতুন বাস্তবতা
এনইউএসের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এআইয়ের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থাকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণা, কোডিং, লেখালেখি, তথ্য বিশ্লেষণসহ নানা কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
একদিকে এআই শিক্ষার্থীদের দ্রুত তথ্য খুঁজে বের করা, জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করা এবং সৃজনশীল কাজে সহায়তা করার সুযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে ভুল তথ্য, অতিরিক্ত নির্ভরতা, একাডেমিক সততা ও মৌলিক চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার মতো প্রশ্নও সামনে আসছে।
এনইউএসের পদ্ধতিতে তাই এআইকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ও কার্যকর ব্যবহার শেখানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথম বর্ষ থেকেই এআই সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া এবং পরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন একাডেমিক প্রোগ্রামে এর ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেতরের জন্যও প্রস্তুত করতে চাইছে।
এআই দক্ষতা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে
বর্তমান কর্মবাজারে এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট কম্পিউটার বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীর জন্যই এআই সম্পর্কে মৌলিক ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ব্যবসা, অর্থনীতি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, গবেষণা কিংবা মানবিকবিদ্যা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য বিশ্লেষণ ও কাজের দক্ষতা বাড়াতে এআই ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির অংশ হয়ে উঠছে।
এনইউএসের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনকেই প্রতিফলিত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির কাছে এআই শেখা এখন শুধু অতিরিক্ত কোনো দক্ষতা নয়; বরং উচ্চশিক্ষার অংশ হিসেবেই তা প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এনইউএসের সব নবীন স্নাতক শিক্ষার্থীর জন্য জেনারেটিভ এআই কোর্স বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষায় এআইয়ের ভবিষ্যৎ ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। চ্যাটজিপিটি ও অন্যান্য এআই টুল ব্যবহারের সুযোগের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা ও মানবিক বিচারবোধের ওপর জোর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে।
এবং দীর্ঘ মেয়াদে একাধিক এআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য এআই শেখার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস