
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে জনগণ ও গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে অপরাধ দমনে রাতারাতি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না।
বুধবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত দোয়া ও আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এমন কোনো অপরাধ নেই, যেটা সংঘটিত হওয়ার পরপরই পুলিশ বাহিনী সেটা (অপরাধীকে) গ্রেপ্তার করতে পারেনি।’ তবে অপরাধ দমনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা, মনোবল, আধুনিকায়ন এবং জবাবদিহি বাড়ানোর কাজ চলছে।
‘ভঙ্গুর অবস্থায় পাওয়া বাহিনীর মনোবল ফিরছে’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যে ভঙ্গুর অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, গত ছয় মাসে তাদের মনোবল ধীরে ধীরে ফিরছে।
তাঁর দাবি, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পূর্ণ শক্তি দিয়ে অপরাধ দমনে কাজ করছে। দায়িত্ব পালনে সদস্যদের উৎসাহিত করতে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার, সনদ ও পদক দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
অপরাধ দমনে সরকারের নীতির কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ নীতি অনুসরণ করছে। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাহিনীগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে রাতারাতি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না।
আলোচিত অপরাধের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, রংপুরের আলোচিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় যৌক্তিক সময়ের মধ্যে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
মিরপুরের শিশুধর্ষণ ও হত্যা থেকে শুরু করে জাতীয়ভাবে আলোচিত এবং তুলনামূলক কম আলোচিত বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
কোথাও কোথাও সমাজের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত বিচার শেষ করতে সহযোগিতা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যে অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের আদালতের মুখোমুখি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিকায়নে জোর
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য বাহিনীগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিকায়ন, তাদের মনোবল বাড়ানো এবং জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার কাজ একসঙ্গে চলছে।
শুধু পুলিশ নয়, অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইনি কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে এসব বাহিনীর কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়নের জন্য বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তিনি।
জনগণ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়—এমন বার্তাও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে জনগণ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধের তথ্য প্রদান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকারও প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়।
ঈদে মিলাদুন্নবীর শিক্ষায় শান্তি ও ন্যায়বিচারের আহ্বান
অনুষ্ঠানে ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) তাৎপর্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, মহানবীর জীবনাদর্শে শান্তি, ক্ষমা, ধৈর্য, সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শিক্ষা রয়েছে। দেশে ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়, সাম্য ও শৃঙ্খলার পথে চলার আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায়বিচার, সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলার বিষয়টিও উঠে আসে। তাঁর মতে, একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় শুধু অপরাধ দমন নয়, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সহমর্মিতার পরিবেশও প্রয়োজন।
‘অপরাধী যত ক্ষমতাশালীই হোক, আইনের আওতায় আনতে হবে’
অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধী যে-ই হোক এবং যত ক্ষমতাশালীই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তাঁর উদ্দেশে রুহুল কবির রিজভী বলেন, মানুষ দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। মাদক ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা চক্র যেন আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি অপরাধী চক্রের পেছনে থাকা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করা জরুরি।
রংপুরের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে রিজভী
রংপুরের ঘটনায় চারজন নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে শুধু গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের অপরাধী চক্র কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে এবং তাদের পেছনে কারা রয়েছে, তা শনাক্ত করে নির্মূল করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
অপরাধের মূল কারণ ও পেছনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত না করা গেলে একই ধরনের অপরাধ পুনরায় ঘটতে পারে—রিজভীর বক্তব্যে এমন উদ্বেগও প্রতিফলিত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের বক্তব্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দুই ধরনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে রুহুল কবির রিজভী অপরাধী গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধী চক্রের উৎস ও পেছনের মদদদাতাদের শনাক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাহিনীর আধুনিকায়ন ও মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কাজও চলছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের বদলে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে মাদক, অপরাধী চক্র এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দোয়া ও মিলাদ অনুষ্ঠানে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালামসহ বিএনপি ও দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।