
নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ। নেপালের পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৫৭৯ জন পর্যটকের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক।
দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে নেপাল সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী। তবে দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
নেপালি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলায় এবং আরও ২৬ জনের মরদেহ ইস্ট নওয়ালপরাসি জেলায় পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
পুলিশ প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে বন্যার ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। কোথাও নদীর প্রবল স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখা গেছে, আবার কোথাও কাদামাটির নিচে চাপা পড়া বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দৃশ্যমান রয়েছে। দুর্গত বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে।
নিখোঁজ শত শত পর্যটক
নেপালের পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ৫৭৯ পর্যটকের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগটি শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, দেশটিতে অবস্থানরত বিদেশি পর্যটকদের জন্যও বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নেপালে অন্তত ৫৪ জন মার্কিন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। রসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে দেশটি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে ৫ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জরুরি আশ্রয়, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী সরবরাহে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, নেপালে ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেরও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজ্যটির ১০৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে কলকাতার ৩২ জন।
নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বড় সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা এবং আকস্মিক বন্যার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত ও উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোয় বড় ক্ষতি
প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালের বিদ্যুৎ খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দুর্গত অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জলবিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাহাড়ি নদী ও জলপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে দেশটির বিপুলসংখ্যক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হয়। বন্যা ও ভূমিধসে এসব স্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে।
নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সতর্কতা
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, দুর্গত এলাকাগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
বন্যার পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। ভূমিধসপ্রবণ পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোকে একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, আটকে পড়াদের উদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করতে হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব না হলে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
চীনের তিব্বতেও শত শত নিখোঁজ
নেপালের পাশাপাশি আকস্মিক বন্যার প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী চীনের তিব্বতেও। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে বন্যায় তিনজন মারা গেছেন এবং নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে সিসিটিভি।
এর আগে বুধবার সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সেখানে অন্তত ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এক দিনের ব্যবধানে নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে মৃতের সংখ্যা এখনো তিনজনই রয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ উদ্ধার অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
গিরং কাউন্টি নেপাল সীমান্তবর্তী তিব্বতের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেখানে অবস্থিত গিরং সীমান্তপথ চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের অন্যতম প্রধান সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র।
বন্যা ও ভূমিধসের কারণে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের যোগাযোগ ও যাতায়াতও ব্যাহত হয়েছে। ফলে দুর্যোগের প্রভাব স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী পর্যটক ও অন্য ব্যক্তিদের ওপরও পড়েছে।
উদ্ধার অভিযানে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
নেপালে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিভিন্ন দেশের সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের নিখোঁজ থাকার তথ্য প্রকাশ করেছে এবং নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
একই সময়ে নেপাল সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গত এলাকাগুলোতে দ্রুত পৌঁছানো। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ভূমিধস, বন্যার স্রোত এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দলের প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের কতজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে—তা এখনো অনিশ্চিত। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।