
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শরৎকালীন প্রতিযোগিতার আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করতে আবারও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্কলাস্টিকা ইন্টারন্যাশনাল টেক সামিট (এসটিএস ’২৬)। প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার সমন্বয়ে আয়োজিত এই সামিট স্কলাস্টিকা মিরপুর ক্যাম্পাসের প্রোগ্রামিং ক্লাবের ফ্ল্যাগশিপ আয়োজন হিসেবে এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে ফিরছে।
আগামী ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর স্কলাস্টিকা সিনিয়র মিরপুর ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবে দুই দিনব্যাপী এসটিএস ’২৬। আয়োজকদের লক্ষ্য, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধারণা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি তারা নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন, নতুন ধারণা বিনিময় এবং ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় আয়োজন
স্কলাস্টিকা ইন্টারন্যাশনাল টেক সামিটের এবারের আয়োজন অবশ্য প্রথম নয়। গত বছরের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এসটিএস ’২৫ ব্যাপক সাড়া ও সাফল্য অর্জন করে। সেই অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় আয়োজন নিয়ে প্রস্তুত হয়েছে এসটিএস ’২৬।
আয়োজকদের পরিকল্পনায় এবার প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখাকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতার বৈচিত্র্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ব্যবসা, কূটনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও গেমিংয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্যও রাখা হয়েছে আলাদা প্রতিযোগিতা।
১৩ বিভাগে প্রতিযোগিতার সুযোগ
এসটিএস ’২৬–এ মোট ১৩টি প্রতিযোগিতা বিভাগ থাকছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—হ্যাকাথন, টেক ট্রিভিয়া, নাম্বার থিওরি, ইনোভেটর’স অ্যারেনা, সাসটেইনোভেট, সাইবার ডিপ্লোম্যাসি, সাইবার ফরেনসিকস, র্যাপিড রেন্ডার, পিচ কম্পিটিশন, রোবোটিকস, মোশন মাস্টারমাইন্ড, টেনসর ওয়ার্স এবং ই–স্পোর্টস ফিফা।
প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকছে। কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান ও প্রোগ্রামিং দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও আবার নতুন ধারণা তৈরি, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, কৌশলগত চিন্তা কিংবা বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্ব পাবে।
হ্যাকাথনের মতো বিভাগে প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধান ও নতুন সমাধান তৈরির দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকছে। টেক ট্রিভিয়া শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান ও তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করবে। অন্যদিকে নাম্বার থিওরি গণিত ও যুক্তিভিত্তিক চিন্তার দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করবে।
ইনোভেটর’স অ্যারেনা ও সাসটেইনোভেটের মতো বিভাগে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনী চিন্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পিচ কম্পিটিশনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ধারণাকে উপস্থাপন করার সুযোগ পাবে, যা ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
টেনসর ওয়ার্সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ
এবারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নতুন সংযোজন টেনসর ওয়ার্স। বাংলাদেশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অলিম্পিয়াড (বিডিএআইও)–এর সহযোগিতায় এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা ও প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন সময়ে শিক্ষার্থীদের এ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি সমস্যা সমাধান ও উদ্ভাবনী চিন্তায় উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই টেনসর ওয়ার্সকে সামিটের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে।
বিডিএআইওর সঙ্গে এই অংশীদারত্ব প্রতিযোগিতাটিকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
যুক্ত হচ্ছে ই–স্পোর্টস ফিফা
প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে এবার নতুন সংযোজন হিসেবে থাকছে ই–স্পোর্টস ফিফা। প্রতিযোগিতামূলক গেমিংয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সামিটে অংশগ্রহণের ভিন্ন একটি ক্ষেত্র তৈরি করবে।
ভার্চ্যুয়াল কৌশল নির্ধারণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিপক্ষের গতিবিধি বিশ্লেষণ এবং চাপের মধ্যে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দক্ষতা এই প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে সামিটের প্রচলিত প্রযুক্তি ও প্রোগ্রামিংভিত্তিক আয়োজনের বাইরে গেমিংয়েও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তির সঙ্গে কূটনীতি ও সংকট ব্যবস্থাপনা
এসটিএস ’২৬–এর আরেকটি ব্যতিক্রমী বিভাগ সাইবার ডিপ্লোম্যাসি। আধুনিক ভূরাজনীতি, প্রযুক্তি ও সংকট ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিভাগটি বিশেষভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সাইবার ডিপ্লোম্যাসিতে অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবসম্মত সংকট পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
প্রযুক্তি সামিটের প্রচলিত প্রোগ্রামিং বা হার্ডওয়্যারভিত্তিক প্রতিযোগিতার বাইরে এমন একটি বিভাগ শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আন্তঃসম্পর্ক সম্পর্কে ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ করে দেবে।
এ ছাড়া সাইবার ফরেনসিকস বিভাগে ডিজিটাল অপরাধ ও সাইবার নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে। সব মিলিয়ে সামিটের প্রতিযোগিতাগুলো প্রযুক্তিকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর বিভিন্ন ব্যবহারিক ও সৃজনশীল দিককে সামনে নিয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ
এসটিএস ’২৬–এর পরিসর শুধু ঢাকা বা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইনোভেটর’স অ্যারেনা, মোশন মাস্টারমাইন্ড ও সাসটেইনোভেটের মতো সাবমিশনভিত্তিক প্রতিযোগিতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও অংশ নিতে পারবেন।
এর ফলে সামিটটি দেশীয় প্রতিযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তার আদান–প্রদানের সুযোগ তৈরি করতে চাইছে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একই প্ল্যাটফর্মে নিজেদের ধারণা ও কাজ উপস্থাপন করলে পারস্পরিক শেখার সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিযোগিতার বাইরে বিনোদনের আয়োজন
দুই দিনব্যাপী সামিটে শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, শিক্ষার্থীদের বিনোদন ও পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আয়োজনে থাকছে বিভিন্ন ইন্টারঅ্যাকটিভ কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও বৈচিত্র্যময় খাবারের ব্যবস্থা।
প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিযোগিতার ব্যস্ততার পাশাপাশি এসব আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, আয়োজক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগ ও ধারণা বিনিময়ের সুযোগও বাড়াবে।
খাবারের বিষয়েও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুই দিনব্যাপী আয়োজনজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা থাকবে। ফুড পার্টনার ‘স্ম্যাশড’-এর সহযোগিতায় প্রতিযোগিতার ব্যস্ততার মধ্যেও অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাদ্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আয়োজনটির অ্যাসোসিয়েট পার্টনার হিসেবে রয়েছে প্রথম আলো।
নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা
এসটিএস ’২৬–এ অংশ নিতে নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের শেষ সময় ৫ সেপ্টেম্বর।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে আগ্রহী বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এবারের সামিটে অংশ নেবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিকস, প্রোগ্রামিং, উদ্যোক্তা–চিন্তা ও প্রতিযোগিতামূলক গেমিংয়ের মতো দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্রগুলোতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ায় এবারের আয়োজন ঘিরে প্রত্যাশাও বেশি।
সব মিলিয়ে এসটিএস ’২৬ শুধু একটি প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা নয়; বরং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীল চিন্তার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার একটি উদ্যোগ হিসেবে সামনে আসছে। গত বছরের সাফল্যের পর এবার ১৩টি বিভাগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রতিযোগিতা, ই–স্পোর্টস এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সামিটটিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
আগামী ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর স্কলাস্টিকা সিনিয়র মিরপুর ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিতব্য এই আয়োজনের দিকে এখন নজর থাকবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নতুন ধারণার দিকে। তাঁদের উদ্ভাবনী চিন্তা থেকেই হয়তো উঠে আসতে পারে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও সমস্যা সমাধানের নতুন কোনো সম্ভাবনা।