
জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট চলছে দাবি করে তিনি বলেন, দুষ্টু লোকেরা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘টুকু আসে, টুকু যায়’ বলে ব্যঙ্গ করেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা এসব কথা বলেন।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়ে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দুষ্টু লোকেরা বলেন, টুকু আসে, টুকু যায়। এই আসে, এই যায়। কতক্ষণ থাকে, তারা নাকি বুঝতে পারেন না।’
ছয় মাসে ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানোর দাবি
জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দুরবস্থার প্রভাব শিল্প ও কর্মসংস্থানে পড়ছে বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যখন তেলের দাম বাড়ছে, যখন বিদ্যুতের জন্য হাহাকার, যখন গ্যাস পাওয়া যায় না, তখন এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি যারা দিয়েছিল নির্বাচনে, তারা ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে ৬২ হাজার লোক চাকরি হারিয়েছেন।’
শুধু কর্মসংস্থান কমে যাওয়া নয়, এ সময়ে ৯ শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। ফলে যাঁরা বর্তমানে চাকরিতে আছেন, তাঁদের কর্মসংস্থান কত দিন টিকে থাকবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন রুমিন ফারহানা।
তাঁর ভাষায়, ‘৯ শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁদের চাকরি কত দিন থাকবে, আল্লাহ জানে।’
সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন
সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারমূলক কাজের প্রসঙ্গও সংসদে তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, এসব অগ্রাধিকারের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতে নিশ্চয়তা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
তবে তাঁর দাবি, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি—তিন ক্ষেত্রেই চাপ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার যদি ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে জনগণকে এর বাস্তব সুফল পেতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের আচরণেরও সমালোচনা করেন রুমিন ফারহানা।
তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কখনো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেন, আবার কখনো শব্দের কারসাজির মাধ্যমে মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মুশকিল হয়, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন—তিনি হয় ব্যঙ্গ করেন, না হলে বাক্চাতুর্য দিয়ে পুরো বিষয়টি ঢেকে দিতে চান।’
তাঁর মতে, সংসদে সরকারের বক্তব্যের বাইরে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের মূল্যায়নের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
‘৬৪ জেলায় ৬৪ জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে মন্দ হতো না’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ তুলে ধরতে গিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যও করেন রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে কথা বললে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক মন্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দেশের ৬৪ জেলার জন্য ৬৪ জন আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে হয়তো ভালো হতো।
রুমিন ফারহানার ভাষায়, ‘কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, বাংলাদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেমন ৩ জন মন্ত্রী আছেন, ৬৪ জেলায় ৬৪ জন আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে মন্দ হতো না।’
তাঁর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও অসন্তোষকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
জ্বালানি সংকট ও কর্মসংস্থান নিয়ে সংসদে উদ্বেগ
রুমিন ফারহানার বক্তব্যে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানের সম্পর্কও গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, গ্যাসের সংকট এবং লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।
তিনি যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, তাতে ছয় মাসে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং ৯ শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে তিনি সরকারের কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি—তিন সংকটের কথা
সংসদে রুমিন ফারহানার বক্তব্যে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের তিনটি বিষয়—আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি—একসঙ্গে উঠে আসে। তাঁর অভিযোগ, তিন ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ চাপের মধ্যে রয়েছে।
একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা এবং সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। তাঁর সমালোচনার মূল বিষয় ছিল—সরকার যে প্রতিশ্রুতি ও অগ্রাধিকারের কথা বলেছে, তার বাস্তব প্রতিফলন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ঘটছে।
সংসদে তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জ্বালানি সংকট, লোডশেডিং, শিল্পকারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়গুলো আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্য ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে বলে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দাবি করছেন, সেটিও আলোচনায় এসেছে।