
রয়টার্স
বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে অভিবাসী ভিসাপ্রার্থীদের নির্ধারিত সাক্ষাৎকারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এ সিদ্ধান্ত সব ধরনের মার্কিন ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অ-অভিবাসী ভিসার নিয়মিত আবেদন ও সাক্ষাৎকার এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়ছে না।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মঙ্গলবার জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে একটি বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করা হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভিসাসেবা–সংক্রান্ত কিছু অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হবে।
এর ফলে যেসব অভিবাসী ভিসাপ্রার্থীর সাক্ষাৎকারের সময় আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল, তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের ই-মেইলের মাধ্যমে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। নতুন সাক্ষাৎকারের তারিখ পরে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে তাঁদের অবহিত করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটির নির্দিষ্ট সময়সূচি বা বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে দপ্তর জানিয়েছে, এর অন্যতম লক্ষ্য হলো কনস্যুলার কর্মকর্তাদের এমন আবেদনকারীদের শনাক্ত করার বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি জনকল্যাণমূলক সুযোগ–সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন বলে মনে করা হয়।
এ ছাড়া ভিসাপ্রার্থীদের মূল্যায়ন যেন আরও সামগ্রিক, ধারাবাহিক ও একই ধরনের মানদণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়, সেটিও প্রশিক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অর্থাৎ, নতুন পদক্ষেপটি শুধু সাক্ষাৎকারের সময়সূচি পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আবেদন করা ব্যক্তিদের যাচাই–বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকেও আরও কঠোর করার বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণের খবরটি প্রথম প্রকাশ করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন দেশের মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে যেসব অভিবাসী ভিসাপ্রার্থীর সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত ছিল, তাঁদের ই-মেইল করে জানানো হয়েছে যে সাক্ষাৎকারের সময় পরিবর্তন করা হচ্ছে। নতুন তারিখ পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই–বাছাই—এসবকে প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দেশটির সরকারি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো।
তবে প্রশাসনের অভিবাসন নীতির আওতা শুধু অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈধ অভিবাসী, শিক্ষার্থী ও ভিসাপ্রার্থীদের নিয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের কারণেও কিছু ব্যক্তির ভিসা বা গ্রিন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। কিছু আবেদন প্রত্যাখ্যানও করা হয়েছে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে প্রবেশ ও বসবাস করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে এর আগেও আইনি বাধা এসেছে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এক বিচারক প্রশাসনের এমন একটি নীতি বাতিল করেন, যার আওতায় বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়া স্থগিত করা হয়েছিল।
ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে বিচারক প্রশাসনের পদক্ষেপকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
ফলে আগের সেই স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রশাসনকে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। নতুন করে অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্তও এমন এক সময়ে এলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি নিয়ে আদালত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে।
নতুন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের ভিসা আবেদন বা সাক্ষাৎকার বন্ধ করেনি।
মূলত অভিবাসী ভিসাপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে অভিবাসী ভিসার আবেদন করেছেন, তাঁদের ওপর এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
পর্যটন, ব্যবসা, শিক্ষা বা অন্যান্য অ-অভিবাসী উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ভিসা কার্যক্রমকে এই সিদ্ধান্তের আওতায় নেওয়া হয়নি।
তবে অভিবাসী ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট কবে আবার স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিষয়ক কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নীতিগুলো বৈষম্যমূলক এবং এর ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আরও আশঙ্কা, কঠোর অভিবাসন অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করছে। তাঁদের অভিযোগ, জাতিগত বা জাতীয় পরিচয়ের কারণে কিছু মানুষ অতিরিক্ত সন্দেহ, নজরদারি বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এসব সমালোচনার বিপরীতে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভিবাসন আইন কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছিল তাঁর প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়।
ক্ষমতায় ফিরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে তাঁর প্রশাসন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই কঠোর নীতির প্রভাব বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাতেও পড়ছে।
অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার পুনর্নির্ধারণের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত তারই আরেকটি উদাহরণ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অপেক্ষায় থাকা হাজারো মানুষের পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং নতুন যাচাই–বাছাইয়ের মানদণ্ডে আবেদনকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে যাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা কঠিন হয়ে ওঠে।