
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। শুক্রবার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে কোনো ধরনের খরচ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে দেশটি। বিমানভাড়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় ছাড়াই এসব কর্মীকে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে প্রথম দলটি মালয়েশিয়া যেতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগের সরকারের সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, দুঃশাসন ও সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকারের উদ্যোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে বাজারটি আবার চালুর পথ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের এসব বৈঠক ও আলোচনায় বাংলাদেশের কর্মীদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এর ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষমতা মালয়েশিয়া সরকারের হাতে রয়েছে। ওই সমঝোতার মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান আগের অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় ছিল।
তবে আগের সরকারের সময় সুবিধাভোগী বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অন্য এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল।
বিশেষ বিবেচনায় মালয়েশিয়া ২৫টি এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত করেছে। একই সঙ্গে আরও ৩১২টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও এই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে।
এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, অতীতে এতগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এ ধরনের যাচাই-বাছাইয়ের নজির ছিল না। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি সংশ্লিষ্টতাও ছিল না বলে জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন চুক্তির মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হবে বলে আশা করছে সরকার।
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিল। বিষয়টি যাচাই করতে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি দল বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন মেডিক্যাল সেন্টার সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।
এ কারণে চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে।
তবে মালয়েশিয়া সরকারের বিদ্যমান অনুমোদিত তালিকা থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে বিতর্কিত ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ১৬টি মেডিক্যাল সেন্টার দিয়ে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শ্রমবাজার চালুর পর দ্রুততম সময়ে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার ভিত্তিতে মেডিক্যাল সেন্টারগুলো যাচাই করবেন। এরপর নতুন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মতে, এসব তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
সরকারের দাবি, বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে যে প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হতে পারে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি রেমিট্যান্স বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত ও বিস্তারিত প্রক্রিয়া এখনো নির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে যথাসময়ে সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা প্রকাশের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টাকা-পয়সার লেনদেন করবেন না। একইভাবে মেডিক্যাল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অপেক্ষা করতে হবে।
সরকারি নির্দেশনা প্রকাশের পরই নির্ধারিত নিয়মে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য কর্মপ্রত্যাশীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।