
আড়াই শতকের ইতিহাসে খুব কম সময়ই যুদ্ধের বাইরে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। স্বাধীনতার জন্য লড়াই থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধ, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক, আফগানিস্তান এবং সর্বশেষ ইরান—প্রায় প্রতিটি বড় সামরিক সংঘাতই দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে।
কোনো যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে পরিণত করেছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে, কোনোটি বদলে দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সমাজকে। আবার কোনো যুদ্ধ রেখে গেছে গভীর ক্ষত, রাজনৈতিক বিভাজন ও দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সংকট।
এসব সংঘাতের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হয়েছে বিপুল মূল্যও। লাখো মানুষের প্রাণহানি, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি, আহত ও যুদ্ধাহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়—সব মিলিয়ে মার্কিন সামরিক ইতিহাসের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বিশাল।
প্রতিটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনে থাকে একটি ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের সেই ইতিহাসের সূচনাও হয়েছিল বন্দুকের গুলিতে। আড়াই শতক আগে ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটনের একটি গ্রামীণ প্রান্তরে ব্রিটিশ সেনাদের মুখোমুখি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনাধীন উপনিবেশগুলোর মিলিশিয়া। সেখান থেকেই শুরু হয় এমন এক যুদ্ধের পথচলা, যার পরিণতিতে জন্ম নেয় যুক্তরাষ্ট্র নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
এরপর কখনো স্বাধীনতা, কখনো জাতীয় ঐক্য, কখনো মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, আবার কখনো বৈশ্বিক প্রভাব ও নিরাপত্তার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। কোনো যুদ্ধ শেষ হয়েছে স্পষ্ট বিজয়ে, কোনোটি অমীমাংসিত অবস্থায়, আবার কোনোটি শেষ হয়েছে সেনা প্রত্যাহার কিংবা এমন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে, যা কোনো পক্ষের প্রত্যাশাই পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
তবে প্রতিটি যুদ্ধের একটি অভিন্ন মূল্য ছিল—প্রাণহানি, ধ্বংস ও বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক ইতিহাসের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তুলে ধরা হলো। প্রথম পর্বে থাকছে স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে কোরীয় যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ের হিসাব।
স্বাধীনতাযুদ্ধ: গুলির চেয়ে রোগ আর কারাগারেই ঝরেছে বেশি প্রাণ
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এমন একটি গুলির মাধ্যমে, সেটি কে ছুড়েছিল—তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটন ও কনকর্ডে ব্রিটিশ সেনা এবং উপনিবেশগুলোর মিলিশিয়ার মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় প্রায় আট বছরব্যাপী স্বাধীনতাযুদ্ধ।
ইতিহাসে এ অজ্ঞাত প্রথম গুলিটি ‘দ্য শট হার্ড রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই গুলিই স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
কর আরোপ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া সংঘাত ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ নেয়। ১৭৮৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
তবে যুদ্ধের মূল্য ছিল অত্যন্ত বড়।
আমেরিকান ব্যাটলফিল্ড ট্রাস্টের হিসাবে, এ যুদ্ধে প্রায় ৬ হাজার ৮০০ মার্কিন যোদ্ধা নিহত এবং ৬ হাজার ১০০ জন আহত হন। ২০ হাজারের বেশি যোদ্ধা বন্দী হন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের গুলিই ছিল মৃত্যুর প্রধান কারণ—এমন নয়।
রোগে মারা যান আরও অন্তত ১৭ হাজার মার্কিন। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার ছিলেন যুদ্ধবন্দী। নিউইয়র্ক বন্দরে নোঙর করা ব্রিটিশ জাহাজগুলোকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অস্বাস্থ্যকর ও নির্মম পরিবেশে সেখানে বহু যুদ্ধবন্দীর মৃত্যু হয়।
ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড এইচ. পেকহ্যামের হিসাব অনুযায়ী, আট বছরে মোট ২৫ হাজার ৫৩৪ মার্কিন যোদ্ধার মৃত্যু হয়। তাঁদের মাত্র ২৭ শতাংশ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। বাকিদের মৃত্যু হয় রোগ, অস্বাস্থ্যকর সেনাশিবির কিংবা কারাগারজীবনের কারণে।
তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন উপনিবেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ লাখ। ফলে যুদ্ধে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশের সমান। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার অনুপাতে একই মাত্রার প্রাণহানি ঘটলে সংখ্যাটি দাঁড়াত প্রায় ৩৫ লাখ।
অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে পরবর্তী যুদ্ধগুলোর তুলনায় স্বাধীনতাযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা কম হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতগুলোর একটি।
গৃহযুদ্ধ: সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ, যার ক্ষত শুকাতে লেগেছে শতাব্দী
স্বাধীনতার যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। আর গৃহযুদ্ধ দেশটিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল ভোরের আগে সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লসটন বন্দরের ফোর্ট সামটারে কনফেডারেট বাহিনী গোলাবর্ষণ শুরু করে। প্রায় ৩৪ ঘণ্টার হামলার পর সেখানে অবস্থানরত ইউনিয়ন বাহিনীর ছোট গ্যারিসন আত্মসমর্পণ করে।
এর পরপরই দক্ষিণের একাধিক অঙ্গরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা’ গঠন করে। দাসপ্রথা, এর বিস্তার এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে কনফেডারেট বাহিনী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।
১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলা এ যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক সংঘাতই ছিল না; সামরিক প্রযুক্তির দিক থেকেও এটি ছিল একটি বড় পরিবর্তনের সময়।
যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় লৌহবর্মে মোড়া যুদ্ধজাহাজ। টেলিগ্রাফ ও রেলপথ সামরিক যোগাযোগ ও সেনা পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মেশিনগান ও সাবমেরিনের ব্যবহারও যুদ্ধের ধরন বদলে দেয়। একই সঙ্গে ক্যামেরায় যুদ্ধের বিভীষিকা ধারণ করে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এ যুদ্ধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার বলে ধরা হতো। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, প্রকৃত প্রাণহানি সম্ভবত এর চেয়ে অনেক বেশি।
নতুন পরিসংখ্যানগত গবেষণায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার বলে অনুমান করা হয়েছে। এমনকি প্রকৃত সংখ্যা ৮ লাখ ৫১ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার হোক কিংবা ৭ লাখ ৫২ হাজার—একটি বিষয়ে বিতর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ।
আমেরিকান ব্যাটলফিল্ড ট্রাস্টের হিসাবে, বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে এ প্রাণহানি প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যুর সমান।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও ছিল বিপুল। ইউনিয়ন ও কনফেডারেসি—দুই পক্ষ মিলিয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থের হিসাবের চেয়েও বড় ছিল মানবিক ক্ষতি। অসংখ্য সেনা গুরুতর আহত হয়ে বাড়ি ফেরেন। অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান। অনেকের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত দেখা দেয়, যাকে বর্তমান সময়ে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফল ছিল দাসপ্রথার অবসানের পথ তৈরি হওয়া। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মুক্তি ঘোষণা এবং পরে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলুপ্তির সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়।
তবে যুদ্ধ শেষ হলেও সংঘাতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষত দ্রুত শুকায়নি। পুনর্গঠন পর্বের পরও বর্ণবাদ, বৈষম্য ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সংঘাত দেশটিকে আরও দীর্ঘ সময় তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: চার সাম্রাজ্যের পতন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেয় তুলনামূলকভাবে দেরিতে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে ইউরোপের অন্যান্য প্রধান শক্তির তুলনায় কম ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বেরিয়ে আসে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে জিমারম্যান টেলিগ্রাম। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির পাঠানো একটি গোপন বার্তা ব্রিটিশ গোয়েন্দারা intercept করে। সেখানে মেক্সিকোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দেয় জার্মানি। বিনিময়ে যুদ্ধ জিতলে টেক্সাস, অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকো ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি আটলান্টিকে জার্মানির নির্বিচার সাবমেরিন হামলাও মার্কিন জনমতকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
২ এপ্রিল ১৯১৭ প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন কংগ্রেসে যুদ্ধের পক্ষে বক্তব্য দেন। চার দিন পর জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কংগ্রেস।
১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এ যুদ্ধে দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৮৫ লাখ সেনা নিহত হন। কামানের গোলা ছিল প্রাণহানির প্রধান কারণ। এরপর ছিল ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ও বিষাক্ত গ্যাস।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি ইউরোপীয় রণাঙ্গনের তুলনায় কম হলেও তা ছিল উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রায় ৪৭ লাখ মার্কিন সেনার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ জন নিহত হন। আহত বা অসুস্থ হন আরও প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার।
মজার বিষয় হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের চেয়ে রোগে মারা যাওয়া মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল বেশি। সরাসরি যুদ্ধে নিহত হন ৫৩ হাজার ৪০২ জন। আর রোগে মারা যান ৬৩ হাজার ১১৪ জন।
এর বড় কারণ ছিল ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি। যুদ্ধের শেষ তিন মাসে এই মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সামরিক মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঘটে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পথও তৈরি হয়।
ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়। কিন্তু যুদ্ধের পরের অস্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত দুই দশক পর আরও ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: যে যুদ্ধ বদলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রকে
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর এক শান্ত রোববার সকালে।
সেদিন সকাল ৮টার কিছু আগে শত শত জাপানি যুদ্ধবিমান হাওয়াইয়ের হনোলুলুর কাছে পার্ল হারবার নৌঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায়। হামলায় আটটি যুদ্ধজাহাজসহ বহু নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। তিন শতাধিক বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিহত হন বেসামরিক নাগরিকসহ ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ।
মার্কিন ন্যাশনাল আর্কাইভসের হিসাবে, হামলায় মোট হতাহতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৩৫। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৮৮টি বিমান, আটটি যুদ্ধজাহাজ, তিনটি হালকা ক্রুজার ও আরও চারটি নৌযান।
হামলার পরদিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট কংগ্রেসের কাছে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানান।
এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক সমাবেশ।
যুদ্ধের আগে মার্কিন সেনাবাহিনীতে সদস্য ছিল ২ লাখেরও কম। যুদ্ধ চলাকালে সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখের বেশি।
জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও গোলাবারুদের বিপুল চাহিদা পূরণে দেশের শিল্পকারখানাগুলো যুদ্ধ উৎপাদনে রূপান্তরিত হয়। লাখো মানুষ যুদ্ধশিল্পে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারীও ছিলেন। ফলে যুদ্ধ মার্কিন শ্রমবাজার ও সামাজিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে।
যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয়—দুই রণাঙ্গনে লড়াই করে।
১৯৪২-৪৩ সালে উত্তর আফ্রিকা ও ইতালিতে অভিযানের পর ১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে অবতরণ করে। ইতিহাসে এ অভিযান ‘ডি-ডে’ নামে পরিচিত।
অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুয়াডালকানাল, তারাওয়া, ইও জিমা ও ওকিনাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপে তীব্র লড়াই চালায় মার্কিন বাহিনী।
১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ স্বাক্ষরের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ লাখের বেশি সেনাসদস্য নিহত হন। আহত হন আরও প্রায় ৭ লাখ।
তবে বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় মার্কিন প্রাণহানি ছিল সামান্য অংশ। সরাসরি যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্ভিক্ষ, রোগ ও খাদ্যসংকটের মৃত্যুও যোগ করলে মোট প্রাণহানি দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি থেকে সাড়ে ৭ কোটি।
অর্থনৈতিক ব্যয়ের দিক থেকেও এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধগুলোর একটি। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে যুদ্ধটির ব্যয় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।
১৯৪৫ সালে শুধু সামরিক খাতেই যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল।
তবে এই বিপুল ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শুধু ক্ষতিগ্রস্তই করেনি; যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক ব্যবস্থায় দেশটির অবস্থানও নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী করে। ১৯৪৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
কোরীয় যুদ্ধ: যুদ্ধবিরতিতে শেষ, সাত দশকেও মেটেনি বিভাজন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর পর আবার বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। এবার যুদ্ধক্ষেত্র ইউরোপ নয়, কোরীয় উপদ্বীপ।
১৯৫০ সালের ২৫ জুন প্রায় ৭৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় কোরীয় যুদ্ধ, যাকে শীতল যুদ্ধের প্রথম বড় সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরীয় উপদ্বীপকে ৩৮তম সমান্তরাল রেখা বরাবর ভাগ করে নেয়। উত্তরে গড়ে ওঠে সোভিয়েত-সমর্থিত উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণে মার্কিন-সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়া।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়। ওয়াশিংটনের কাছে এটি ছিল আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানোর লড়াই।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। চীনও যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ছিল ১৯৫০ সালের শেষ দিকে চোসিন জলাধারের যুদ্ধ। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়া মার্কিন মেরিনরা প্রায় ১৭ দিন চীনা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেন। পরে তারা অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে।
কোরীয় যুদ্ধে মোট কত মানুষ নিহত হন, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে পার্থক্য রয়েছে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার একটি হিসাবে অন্তত ২৫ লাখ মানুষ নিহত হন। তাঁদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে কিছু গবেষণায় মোট প্রাণহানি প্রায় ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর প্রাণহানির হিসাব তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। বিভিন্ন সূত্রে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ৩৬ হাজার ৫০০ থেকে প্রায় ৪০ হাজারের মধ্যে।
তিন বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী সীমান্তে গড়ে ওঠে প্রায় দুই কিলোমিটার প্রশস্ত নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোন (ডিএমজেড)।
সাত দশকেরও বেশি সময় পরও সেই বিভাজন টিকে আছে।
কোরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতের চরিত্র আরও বদলে যায়। যুদ্ধ আর শুধু ইউরোপের সমতল ভূমি কিংবা কোরিয়ার পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গল, মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি এবং পরবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়ার দুর্গম অঞ্চলেও।
ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক ও আফগানিস্তান—প্রতিটি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, বৈদেশিক নীতি ও অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
আর সর্বশেষ ইরান যুদ্ধ সেই দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে।
দ্বিতীয় পর্বে থাকছে: ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ইরান যুদ্ধ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য; ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়, মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং এসব যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানে কী পরিবর্তন এসেছে।
তথ্যসূত্র: হিস্ট্রি ডটকম, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, ইউএস ন্যাশনাল আর্কাইভস, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, আমেরিকান ব্যাটলফিল্ড ট্রাস্ট, ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্টসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।