
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও চলমান সংঘাতের মধ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে ইরান। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত তেল বিক্রি থেকে পাওয়া এই অর্থ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স।
গতকাল শনিবার ইরানের জ্বালানি তেল মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ফার্স জানায়, তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের এই পরিমাণ সরকারের নির্ধারিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা সত্ত্বেও দেশটি তেল রপ্তানি থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের জ্বালানি তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় করা ব্যয়ের একটি বড় অংশ মেটানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ চলমান সংঘাত ও অবরোধের মধ্যে তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত রাজস্ব ইরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
তবে তেহরানের এই আয় এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য উভয়ই বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
অবরোধের মধ্যেও তেল বিক্রি
ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি জ্বালানি তেল। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল রপ্তানি বহু বছর ধরেই নানা বাধার মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নৌ অবরোধ ও সামরিক সংঘাতের প্রভাব।
তেহরানের দাবি, এসব বাধা সত্ত্বেও দেশটি তেল বিক্রি অব্যাহত রাখতে পেরেছে এবং নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করেছে। মার্চ থেকে জুলাই—এই চার মাসে তেল বিক্রি থেকে ৭৫০ কোটি ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার তথ্যকে ইরান তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের জ্বালানি তেল মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ শুধু বর্তমান ব্যয় মেটাতেই সহায়তা করবে না, আগামী কয়েক মাসে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনও পূরণ করবে।
বিশেষ করে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় পরিচালিত ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
হরমুজ প্রণালি এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে প্রণালিতে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু ইরান নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল সীমিত করে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটি উন্মুক্ত করে দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। কারণ, এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
ইরানের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির তেল রপ্তানির বড় অংশ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নৌ অবরোধ ও হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেল বিক্রি থেকে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবু গত চার মাসে ৭৫০ কোটি ডলার আয় করার তথ্য প্রকাশ করে তেহরান দেখাতে চাইছে যে চাপের মধ্যেও তার তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
জুনের সমঝোতা ও হরমুজ প্রণালি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে গত জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে ওই সমঝোতার পরও হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক পরিস্থিতি পুরোপুরি ফিরেনি।
ইরানের কর্মকর্তারা বলে আসছেন, ওয়াশিংটন সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত তেহরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেবে না।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দেশটির ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ছাড় এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
ফলে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হোক, অন্যদিকে ইরান অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব স্বীকার করলেন পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও স্বীকার করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কেউ কেউ দাবি করেন যে নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তা বলে না।
পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, ইরান বর্তমানে যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির বাস্তবতা মেনে নিয়েই দেশ পরিচালনা করতে হচ্ছে।
তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তেহরান একদিকে নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক চাপের কথা স্বীকার করছে, অন্যদিকে সেই চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছে।
তেল বিক্রি থেকে ৭৫০ কোটি ডলার আয় এবং তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার তথ্যও এই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপের মধ্যে থাকলেও তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা এখনো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
‘নজিরবিহীন পরিস্থিতি’ মোকাবিলা করছে তেহরান
তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান গতকাল শনিবার বলেন, যুদ্ধের মধ্যে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে নৌ অবরোধের কারণে ইরান নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
নৌ অবরোধ শুধু তেল রপ্তানির ওপরই প্রভাব ফেলছে না, এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে পণ্য আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া রাজস্ব ইরানের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে গেলে সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্য, ওষুধ, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তাই চার মাসে ৭৫০ কোটি ডলার তেল রাজস্ব অর্জনের বিষয়টি শুধু একটি আয়-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নয়; চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের অর্থনীতি কতটা কার্যকরভাবে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে পারছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে তেল বিক্রি থেকে চার মাসে ৭৫০ কোটি ডলার আয় করতে পারলেও ইরানের সামনে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কমছে না। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ, সমুদ্রপথে বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং চলমান সংঘাত—সব মিলিয়ে তেহরানের অর্থনীতিকে একাধিক চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ইরানের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, অন্তত চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশটি সেই চাপের মধ্যেও তেল বিক্রি থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
তেহরানের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই রাজস্ব প্রবাহ আগামী মাসগুলোতেও বজায় রাখা যাবে কি না। কারণ যুদ্ধ ও নৌ অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে তেল পরিবহন, ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ—সব ক্ষেত্রেই নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার শর্তগুলো বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং তেল রপ্তানির পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এই অবস্থায় তেল বিক্রি থেকে পাওয়া ৭৫০ কোটি ডলার ইরানের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি দিলেও, দেশটির অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে যুদ্ধ, নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই ও ফার্স