
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে আলোচনায় অংশ না নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের দুই সংসদ সদস্য। আজ রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে বিলটি নিয়ে আলোচনা শুরুর আগেই তাঁরা বেরিয়ে যান। এর আগে একই দিনে সকালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনাতেও বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নেননি।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল তোলা হয়। বিল দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য যথাক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে বিল দুটির বিষয়বস্তু ও সেগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে প্রথমবারের মতো সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হলো।
রোববার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন কমিটির দুই বিরোধী দলীয় সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম ও আবদুল বাতেন। বৈঠক শুরু হওয়ার আগে তাঁরা ওয়াকআউট করেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ওয়াকআউটের আগে দুই সংসদ সদস্য বলেন, জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের প্রতিবাদে তাঁরা সংসদ থেকেই ওয়াকআউট করেছিলেন। সেই অবস্থানের ধারাবাহিকতায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও তাঁরা অংশ নেবেন না।
পরে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আবদুল বাতেন বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেন। বিষয়টি নিয়ে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, কমিটির সদস্যদের কোনো সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা বৈঠকে উপস্থাপন, পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিলের বিরোধিতা করার সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে এটাই তাঁদের দায়িত্ব। তবে বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না।
বিল নিয়ে আলোচনা শেষে সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত
বিরোধী দলের দুই সদস্য বৈঠক বর্জন করলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্যরা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকে দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। একই সময়ে মব তৈরির চেষ্টা চললেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি বলেও সভায় আলোচনা হয়।
এ ছাড়া মিরাজ শেখের অপহরণের ঘটনায় সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের দোষারোপের রাজনীতি বা ‘ব্লেম গেম’ পরিহার করা উচিত বলে সভায় মত দেওয়া হয়।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ ও শিরীন সুলতানাসহ কমিটির সংশ্লিষ্ট সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মানবাধিকার কমিশন বিলেও বিরোধী দলের আপত্তি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি রয়েছে। রোববার সকালে আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেননি বিরোধী দলের সদস্যরা।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার ভুক্তভোগী, বিভিন্ন অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ রহিত করেছে। ওই অধ্যাদেশ বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন সংসদে যে বিল উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি আগের ব্যবস্থার তুলনায় আরও দুর্বল এবং সীমিত পরিসরের বলে অভিযোগ বিরোধী দলের।
তাদের আরও বক্তব্য, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক জোটের স্বীকৃত মানদণ্ড, প্যারিস প্রিন্সিপলস এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিরোধী দলের অভিযোগ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিলটির ওপর প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ে অংশীজনদের সঙ্গে যথাযথ মতবিনিময়, বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ এবং স্বাধীনভাবে বিলটি পর্যালোচনা করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষায়, এতে স্থায়ী কমিটিকে কার্যত একটি ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই অবস্থায় আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে থাকা বিরোধী দলীয় সদস্যরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের আলোচনা ও পর্যালোচনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েও তাঁরা অংশ নেবেন না বলে অবস্থান জানিয়েছেন।
অধ্যাদেশ থেকে নতুন বিলের প্রক্রিয়া
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–সংক্রান্ত বিলের পেছনে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার আইনি সংস্কারের ধারাবাহিকতা।
সংবিধান সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কিছু আইনগত পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সে সময় মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বর্তমান সংসদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এর মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন করা হয়নি। ফলে সেগুলো কার্যকারিতা হারায়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, এসব বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশও সেই প্রক্রিয়ার অংশ।
অন্যদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলনের জন্য বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই একটি বিল পাস করা হয়েছিল। তখন সরকার জানিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনের আইন আরও শক্তিশালী করা হবে।
তবে নতুন দুটি আইনের খসড়া অনুমোদনের পর থেকেই মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ ও সমালোচনা দেখা দেয়। বিশেষ করে গুমের অভিযোগ তদন্তের কাঠামো, মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সংসদে ওয়াকআউটের পর কমিটিতেও বিরোধিতা
বিল দুটির বিষয়ে বিরোধী দলের আপত্তি গত বৃহস্পতিবার সংসদে প্রকাশ্য রূপ নেয়। জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল উত্থাপনের সময় বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। এরপর বিল দুটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হলেও বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনার প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ফলে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সরকারের পক্ষের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগও তৈরি হয়নি। বিরোধী দলের দুই সদস্য বৈঠক শুরুর আগেই ওয়াকআউট করায় বিলটি নিয়ে কমিটির বাকি সদস্যরা আলোচনা চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত তা সংসদে প্রতিবেদন আকারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন ওয়াকআউটের সমালোচনা করে বলেছেন, সংসদীয় কমিটিতে ভিন্নমত জানানোর সুযোগ রয়েছে। কোনো সদস্য বিলের সঙ্গে একমত না হলে সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারেন, মতামত জানাতে পারেন কিংবা প্রয়োজন হলে বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু বৈঠক বর্জন সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে বিরোধী দলের অবস্থান হলো, বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ দুটি আইন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার পরিবর্তে তাঁরা প্রতিবাদ ও বর্জনের পথ বেছে নিয়েছেন।
ফলে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য এখন সংসদের মূল অধিবেশন ছাড়িয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রমেও পৌঁছেছে। বিল দুটি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পরিবর্তনসহ সংসদে পাস হয়, সেটিই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।