
ভেনেজুয়েলার বিশাল জ্বালানি তেলসম্পদের একটি বড় অংশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গে হওয়া নতুন চুক্তির আওতায় দেশটির বিপুল পরিমাণ প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ’ পাবে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এর আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র রয়েছে এবং দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহারের অধিকার যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময়ের জন্য পেতে পারে।
ট্রাম্প গত শুক্রবার চুক্তিটিকে বিশ্বের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড়’ তেল চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং দেশটির ভোক্তাদের জন্য জ্বালানির দাম কমবে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারও চুক্তিটিকে অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছে। দেশটির দাবি, চুক্তির ফলে বিপুল বিনিয়োগ আসবে এবং তেলশিল্পের অবকাঠামো পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।
তবে চুক্তি ঘিরে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্প যে পরিমাণ তেলের কথা বলছেন, তার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার সমালোচকদের কেউ কেউ এটিকে ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের প্রশ্ন—এটি যদি সত্যিই ১০০ বছরের জন্য তেলসম্পদ ব্যবহারের অধিকার দেয়, তাহলে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কী হবে?
চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ না হওয়ায় এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। তারপরও তেল, ভূরাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কী পরিমাণ তেল নিয়ে চুক্তি
ট্রাম্পের ঘোষণায় চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের কথা বলা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত তেল মজুতের তুলনায় এটি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুত ছিল। বিশ্বের কোনো দেশেই এর চেয়ে বেশি প্রমাণিত তেল মজুত নেই। বিশ্বের মোট প্রমাণিত তেলসম্পদের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলায় রয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে ধারণা করা হয়।
এই বিপুল সম্পদের কারণেই ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ট্রাম্প নতুন চুক্তিকে বিশাল সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও চুক্তির আওতায় থাকা ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন জ্বালানি বিশ্লেষক। কারণ, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি বা নির্দিষ্ট শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
জ্বালানি তেলের বাজারবিষয়ক গবেষক রোরি জনস্টনের মতে, এই সংখ্যা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অজানা। এত বড় একটি সংখ্যা রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করা সহজ বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
অর্থাৎ চুক্তির আওতায় থাকা তেলের পরিমাণ নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। প্রমাণিত মজুত, উত্তোলনযোগ্য মজুত এবং বাস্তবে যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা সম্ভব—এই তিনটি বিষয় এক নয়। ফলে কাগজে থাকা বিপুল তেলসম্পদের পুরোটা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাবে, এমন ধারণা করাও সঠিক হবে না।
‘যুক্তরাষ্ট্র এইমাত্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। বিশ্বের ইতিহাসের এটা সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল চুক্তি।’
— ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি নিরাপত্তার কারণে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক হলেও দেশটির প্রমাণিত তেল মজুত সীমাহীন নয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রমাণিত তেল মজুত ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ব্যারেল। এর বিপরীতে ভেনেজুয়েলার মজুত কয়েক গুণ বেশি।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুতও কয়েক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দেশটির স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা এসপিআর জরুরি পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৮ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেল তেল রয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভেনেজুয়েলার তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুতে যোগ হবে কি না, নাকি মার্কিন কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিকভাবে তা উত্তোলন ও বিক্রি করবে, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
চুক্তির নেপথ্যে কী
ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের পেছনে রয়েছে কয়েক বছরের তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত।
২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে ছিলেন নিকোলা মাদুরো। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধীদের দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছিল।
ট্রাম্পও মাদুরোর কঠোর সমালোচক ছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, মাদুরো সরকার মাদক কারবারিদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ মাদক প্রবেশে সহায়তা করছে। অন্যদিকে মাদুরো অভিযোগ করে আসছিলেন, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে ওয়াশিংটন।
গত ৩ জানুয়ারি দুই দেশের বিরোধ নাটকীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। ওই দিন ট্রাম্প মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার অভিযানের অনুমোদন দেন। পরে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আটক করা হয়।
মাদুরো বর্তমানে নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এরপর ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার সরকার পরিচালনার জন্য সমর্থন দেয়। রদ্রিগেজ পরে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এর পরপরই ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ে। ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটন ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ হাতে নেবে।
সমালোচকদের অভিযোগ, তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ দিতে রদ্রিগেজ সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে দ্য আটলান্টিক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প রদ্রিগেজকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তিনি যদি ‘সঠিকভাবে’ কাজ না করেন, তাহলে তাঁকে বড় মূল্য দিতে হবে।
ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নতুন নয়। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ‘চুরি’ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা একসময় বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত তেলশিল্প পরিচালনা করত। পরে প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের নেতৃত্বে দেশটির তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা সেই জাতীয়করণকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প জাতীয়করণকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পদ চুরির সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত ঘটনা’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতিতে কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌম অধিকার রাখে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেলকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পদ’ হিসেবে দাবি করার রাজনৈতিক যুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার চারপাশে অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন। এর লক্ষ্য ছিল দেশটির তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ, ভেনেজুয়েলার রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎসই তেল।
এখনই কেন এই চুক্তির ঘোষণা
নতুন চুক্তির সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা এএএ গত সপ্তাহে সতর্ক করেছে, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন ভোক্তাদের প্রতি গ্যালন পেট্রলের জন্য গড়ে ৪ ডলারের বেশি দিতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জন্য ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের বক্তব্য, নতুন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যয় কমবে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির নতুন উদাহরণ
ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তিটিকে কেবল একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা হিসেবে দেখছে না। এটিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, নতুন চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র আরও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে।
রুবিওর মতে, চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমতে পারে এবং একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতেও নতুন বিনিয়োগ আসবে।
ট্রাম্পও সাম্প্রতিক এক সমাবেশে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ককে প্রশংসা করে বলেন, দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর তেল পাচ্ছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হচ্ছে।
এমনকি ভেনেজুয়েলা থেকে পাওয়া তেল দিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের খরচ মেটানো হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে ভেনেজুয়েলার তেল একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক সম্পদ।
দেলসি রদ্রিগেজ কেন রাজি
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারও চুক্তিটিকে নিজেদের জন্য লাভজনক হিসেবে তুলে ধরেছে।
রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হবে।
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প বছরের পর বছর বিনিয়োগের ঘাটতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশটির অর্থনীতির বড় অংশ তেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তেলশিল্প পুনরুদ্ধার ছাড়া অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
রদ্রিগেজ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন চুক্তি থেকে ভেনেজুয়েলা প্রায় ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার কর পেতে পারে। পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে।
সরকারের আশা, এই অর্থ দিয়ে তেলশিল্পের অবকাঠামো পুনর্গঠন, উৎপাদন বাড়ানো এবং বৃহত্তর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।
১০০ বছরের অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ
চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো এর দীর্ঘমেয়াদি চরিত্র।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রদ্রিগেজ সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ১০০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে।
যদি এই তথ্য সঠিক হয়, তাহলে এটি শুধু একটি তেলবাণিজ্য চুক্তি নয়; বরং ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দেশটির সার্বভৌম সম্পদের ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
তবে ১০০ বছরের অধিকার কী ধরনের—মালিকানা, উত্তোলন, পরিচালনা, বিনিয়োগের বিশেষ সুবিধা নাকি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন চুক্তি—তা স্পষ্ট নয়।
তাই চুক্তির পূর্ণ নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ‘যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের মালিক হয়ে গেছে’—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তবে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য কোনো বিদেশি শক্তিকে তেলসম্পদ ব্যবহারের বিশেষ অধিকার দেওয়া হলে তা নিঃসন্দেহে দেশটির ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতি ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভেনেজুয়েলার লাভ কোথায়
চুক্তির পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও তেলশিল্পের দুরবস্থার কারণে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
২০১৪ সাল থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের হিসাবে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বিপুল কর রাজস্ব ও বিনিয়োগ আসবে। তেল উৎপাদন বাড়লে সরকারের আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে এবং তেলশিল্পের অবকাঠামো পুনর্গঠন সম্ভব হবে।
এ কারণে রদ্রিগেজ সরকারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি বাস্তব সুযোগ হতে পারে।
তবে এর বিপরীতে প্রশ্নও রয়েছে—এই অর্থের কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং কতটা তেলশিল্প ও সরকারের হাতে থাকবে, সেটি নির্ভর করবে চুক্তির বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর।
সমালোচকদের আপত্তি কোথায়
সমালোচকদের প্রধান আপত্তি হলো—ভেনেজুয়েলার মতো একটি সার্বভৌম দেশের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশি শক্তির দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক হস্তক্ষেপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বহু পুরোনো।
ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানোর নীতিকে নতুন করে জোর দিয়েছেন। তাঁর নীতিকে কেউ কেউ ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর আধুনিক রূপ হিসেবে দেখছেন।
সমালোচকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ে নতুন চুক্তি সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক নীতির অংশ।
তাঁদের চোখে এটি শুধু বিনিয়োগ বা জ্বালানি সহযোগিতা নয়; বরং অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
জ্বালানি বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউও চুক্তিটির সম্ভাব্য চরিত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এর সঙ্গে ২০ শতকের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদ নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতির তুলনা করেছেন।
তাঁর মতে, অতীতে ইরাক ও ইরানের তেলসম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য পশ্চিমা শক্তিগুলো যে ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল, নতুন চুক্তির সঙ্গে তার কিছু মিল দেখা যেতে পারে।
তাহলে কার লাভ, কার ক্ষতি?
সবচেয়ে সরলভাবে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ববাজারের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য লাভ হলো অর্থ ও বিনিয়োগ। দেশটির দুর্বল তেলশিল্পে বিপুল বিনিয়োগ এলে উৎপাদন বাড়তে পারে, সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য ক্ষতি হলো দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ-নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। যদি বিদেশি কোম্পানি বা যুক্তরাষ্ট্র তেলসম্পদের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার নিজস্ব নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা সীমিত হতে পারে।
এ ছাড়া তেল থেকে যে বিপুল আয় হবে, তার কতটা ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য ব্যয় হবে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বড় প্রশ্ন এখনো অনেক
চুক্তির ঘোষণা হয়ে গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ না হওয়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে? ১৭টি তেলক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের প্রকৃতি কী? বেসরকারি মার্কিন কোম্পানিগুলোর ভূমিকা কী হবে? ভেনেজুয়েলা ঠিক কত রাজস্ব পাবে? বিনিয়োগের অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—১০০ বছরের ব্যবহারের অধিকার থাকলে তার আইনি ও অর্থনৈতিক কাঠামো কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত চুক্তির প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভেনেজুয়েলার তেল এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সম্পদ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের প্রভাব এবং ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি নির্ভরতা তৈরি করবে—তার উত্তর নির্ভর করবে চুক্তির গোপন থাকা শর্ত, বাস্তবায়ন এবং তেল থেকে অর্জিত সম্পদের ওপর কার কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকে, তার ওপর।