
আল–জাজিরা
ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এটি ছিল দীর্ঘদিনের একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণের মুহূর্ত। তিনি বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। ইরান মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটির সরকার টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্রও ঘোষিত সামরিক লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের রাজনৈতিক প্রভাব এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুও যুদ্ধ থেকে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সুবিধা পাননি। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে গাজা ও লেবাননে দীর্ঘ সংঘাতের পর ইরান যুদ্ধও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বাণিজ্য ও জ্বালানি রপ্তানিতে বাধা তৈরি হয়েছে এবং যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতি বিপুল। তবে এসব চাপের মধ্যেও তেহরানের সরকার এখনো ভেঙে পড়েনি।
ফলে ছয় মাসের যুদ্ধের পর তিন দেশই এক ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকটে আটকে আছে। কেউই স্পষ্ট বিজয় দাবি করার মতো অবস্থায় নেই, আবার কেউই সহজে পিছু হটার সুযোগও দেখছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য
২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। জো বাইডেনের প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অন্যতম বড় অভিযোগ ছিল মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা বাস্তব কোনো চুক্তিতে রূপ নেয়নি। ফলে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন জনমত জরিপেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর অভ্যন্তরীণ নীতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিরও সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে অনেক মার্কিন নাগরিক প্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন না।
মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শিবলী তেলহামি আল–জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া আর্থিক ব্যয় এখন অনেক মানুষের কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর মতে, যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, জ্বালানির দাম এবং পরিবারের ব্যয়ের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপেও দেখা গেছে, প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের একজনেরও কম ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
তেলহামি বলেন, শুরুতে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যেও এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে ইসরায়েল ইস্যুটি মার্কিন রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, বিষয়টি এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে মানুষের পকেটে টান পড়া এবং দেশের মূল্যবোধের প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে।
ইরানকে চাপে রাখতে নতুন কৌশল
যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত না হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে রাজি করানো, যা ওয়াশিংটনের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই লক্ষ্যেই তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন পদক্ষেপের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর নরম্যান্ডি অভিযানের প্রতীকী অর্থের সঙ্গে মিল রেখে এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ালেও ইরানের সরকার এখনো টিকে আছে। দেশটির সেনাবাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বেড়েছে। তবু তেহরানে এমন কোনো অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক বিভাজন দেখা যায়নি, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত ফলাফল এনে দিতে পারে।
মার্কিন লেখক ও কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইরানে এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং চাইলে দেশটি সেটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থানও ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারায় ইরান এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারছে।
মিলারের মতে, হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো ইরানের মিত্র সংগঠনগুলো দুর্বল হলেও পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে ধরনের গণরোষ বা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের আশা করেছিল, তা ঘটেনি।
তাঁর ভাষায়, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে এটি তেহরানের জন্য বড় সাফল্য।
এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। মিলারের মতে, ভবিষ্যতের কোনো মার্কিন প্রশাসন এ ধরনের সামরিক অভিযানে যাওয়ার আগে ইরানের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।
ইসরায়েলের জন্যও যুদ্ধের ফল প্রত্যাশিত নয়
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বহু বছর ধরে বলে আসছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে সক্ষম হওয়া তাই নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্জন ছিল।
কিন্তু যুদ্ধের ছয় মাস পর সেই অর্জন কতটা স্থায়ী হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের সিনিয়র টিচিং ফেলো ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যান বলেন, গাজা ও লেবাননের যুদ্ধের পর ইরানেও নেতানিয়াহুকে ব্যর্থ নেতা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
তাঁর মতে, অনেক ইসরায়েলি এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে একটি বড় নিরাপত্তাগত ভুল হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ব্রেগম্যানের ভাষ্য, নেতানিয়াহু ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার পরিবর্তে তেহরানের সরকার পতনের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকেও সেই পথে নিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
বরং যুদ্ধের পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা হলো—ইরানকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখানো হলেও যুদ্ধ সেই হুমকিকে পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
নির্বাচনী সুবিধার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যুদ্ধ প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি।
ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা দানিয়েল লেভির মতে, নেতানিয়াহু সম্ভবত আশা করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের সুবিধা এনে দেবে।
কিন্তু যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। ফলে এটি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক মোড় ঘোরানোর সুযোগ না হয়ে বরং তাঁর ব্যর্থতার তালিকায় আরেকটি বিষয় হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
লেভির মতে, যুদ্ধকে এমন একটি ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি হয়নি।
এমনকি জুনে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের তাঁকে আক্রমণের নতুন সুযোগ দিয়েছে।
এতে ইসরায়েলি সরকারের অভ্যন্তরে এবং জনমতের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথেই যায়, তাহলে এত বড় সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ফল কী?
ইরানের অর্থনীতি: যুদ্ধের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বন্দর অবরোধ, বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা এবং সামরিক ব্যয়—সব মিলিয়ে তেহরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
ইরানের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। গত মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলেও দেশটির হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু মার্কিন অবরোধের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে বলে ইরানের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সংকট যত গভীরই হোক, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এখনো ভেঙে পড়েনি।
ইরানবিষয়ক লেখক ও শিক্ষাবিদ শারভিন মালেকজাদেহ আল–জাজিরাকে বলেন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তবে তাঁর ধারণা, ইরান এখনো এই সংকট সামলে নেওয়ার মতো সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
তাঁর মতে, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষার ধারণা। এই মানসিকতা দেশটির জনগণ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বড় ধরনের চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করছে।
তবে অর্থনীতি নিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ভেতরেও মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে আলোচনায় যাওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
ফলে যুদ্ধ শুধু ইরানের অর্থনীতিকে নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
যুদ্ধের পরও কেন কেউ পিছু হটছে না
ছয় মাসের যুদ্ধের পর তিন পক্ষের অবস্থানই জটিল হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও ইরানকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নতিস্বীকার করাতে পারেনি। ইসরায়েলও ইরানের হুমকি পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। অন্যদিকে ইরান তার সরকার ও সামরিক কাঠামো টিকিয়ে রাখলেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই এখন সরাসরি পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নয়।
ট্রাম্পের জন্য ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয় অর্জন না করতে পারা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। তাঁর প্রশাসন এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে সমঝোতায় আনতে চাইছে।
নেতানিয়াহুর জন্যও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক হুমকি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলেও যুদ্ধ সেই হুমকিকে পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। বরং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এখন যুদ্ধের ফলাফল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
আর ইরানের জন্য যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক প্রতিরোধের বিষয় নয়। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, অর্থনীতি সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে সার্বভৌমত্বের দাবি ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে কী হতে পারে
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো—সামরিক সংঘাত কি নতুন করে তীব্র হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত কূটনীতির পথ খুলবে?
যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। ইরানও হরমুজ প্রণালিসহ নিজের কৌশলগত অবস্থানকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ইসরায়েলও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কথা বলে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে থাকতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও কম নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও যুদ্ধের আর্থিক বোঝা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েলেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে তিনি যুদ্ধের ফলাফলকে কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং ইরানের হুমকি মোকাবিলায় জনগণকে কতটা আশ্বস্ত করতে পারেন তার ওপর।
ইরানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থনীতি। সরকার টিকে গেলেও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও মূল্যস্ফীতি যদি আরও বাড়ে, তাহলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ ছয় মাসের যুদ্ধ কোনো পক্ষকেই নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দেয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান—তিন দেশকেই এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের শুরুতে যে পক্ষগুলো দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিল, ছয় মাস পর তাদের সামনে এখন আরও কঠিন প্রশ্ন—কীভাবে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা যায়, অথচ পরাজিতও মনে না হয়।
সেই কারণেই ইরান যুদ্ধ এখন শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি তিন দেশের নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিক টিকে থাকারও বড় পরীক্ষা।