
ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে বিএনপি সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারী সংগঠন জাতীয় নারীশক্তি। সংগঠনটির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেছেন, নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য দায়সারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘কাঠের চশমা’ খুলে দেশের মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনবিচ্ছিন্ন বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতির সমাধান হবে না। মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে হবে।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ এলাকার ফুটপাতে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এসব কথা বলেন মনিরা শারমিন। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে জাতীয় নারীশক্তি এ সমাবেশের আয়োজন করে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবাদ সমাবেশে জাতীয় নারীশক্তির পক্ষ থেকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
মনিরা শারমিনের অভিযোগ, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। একই সঙ্গে ছিনতাই, ডাকাতি ও রাহাজানির মতো অপরাধও বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় চলাফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তাঁর মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না; নাগরিকেরা বাস্তবে কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
‘কাঠের চশমা খুলে বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে হবে’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের সমালোচনা করে মনিরা শারমিন বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘কাঠের চশমা’ খুলে জনগণের সত্যিকারের অবস্থা দেখতে হবে।
তিনি বলেন, জনবিচ্ছিন্ন মন্তব্য করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মনিরা শারমিনের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতির তথ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় থাকলেও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের ক্ষেত্রে তাঁর কার্যকর পদক্ষেপ যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর কাছ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আরও জোরালো পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ
সমাবেশে সাম্প্রতিক একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় অটোরিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেন জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, গত শুক্রবার ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার পর অটোরিকশা থেকে পড়ে ৫৬ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনের মৃত্যু হয়।
ঘটনাটিকে নাগরিক নিরাপত্তার সংকটের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে মনিরা শারমিন বলেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা।
তাঁর অভিযোগ, ছিনতাই ও রাহাজানির পেছনে মাদকাসক্তি একটি বড় কারণ। দেশের তরুণদের একটি অংশ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও মাদক ও নাগরিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আরও জোরালো বক্তব্য প্রত্যাশা করেন তিনি।
নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবাদ সমাবেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
মনিরা শারমিন বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক এবং নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব শাহরিন সুলতানাও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, যে হারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তাতে দেশে অনিরাপত্তার অনুভূতি বাড়ছে। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে প্রশাসনের অমনোযোগিতা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপের দাবি
সমাবেশে বক্তারা নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও যুক্ত করেন। জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক বলেন, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধের পেছনে মাদক একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তাঁর অভিযোগ, তরুণদের একটি অংশ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লেও এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের যথেষ্ট কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে দাবি করেন তাঁরা।
বিভিন্ন দাবিতে প্ল্যাকার্ড
প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেওয়া নারীদের হাতে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল। এসব প্ল্যাকার্ডে নাগরিক নিরাপত্তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ দমনের দাবি তুলে ধরা হয়।
প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’, ‘কাঠের চশমা খোলো, অপরাধী দমন করো’, ‘আমার ট্যাক্সের টাকায় বেতন, আমার নিরাপত্তা কই?’, ‘নারী ও শিশু নিপীড়ন বন্ধ করো’ এবং ‘মাদকমুক্ত সমাজ চাই’।
এ ছাড়া একটি প্ল্যাকার্ডে সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং চাঁদাবাজি-দখলবাজিসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করে সরকারের কাছে জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়।
সরকারের প্রতি জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান
সমাবেশে জাতীয় নারীশক্তির নেতারা বলেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। রাস্তায় চলাচল, কর্মস্থলে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে গিয়ে মানুষ যাতে ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা বা সহিংসতার শিকার না হন, সে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
তাঁদের মতে, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
জাতীয় নারীশক্তির পক্ষ থেকে তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ছিনতাই-ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগকে অবহেলা না করে সরকারকে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শুধু বক্তব্য বা আশ্বাস নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার বাস্তব অনুভূতিই সরকারের পদক্ষেপের প্রধান মাপকাঠি হবে।