
বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসররা’ দেশে নানা ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর দাবি, প্রথমে একটি চক্রের মাধ্যমে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে সার নিয়েও একই ধরনের সংকট সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে।
সোমবার দুপুরে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জেলা প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে।
জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, একটি চক্র দিনের বিভিন্ন সময়ে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে গিয়ে তেল সংগ্রহ করত। সরকার বিষয়টি শনাক্ত করার পর কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় বলে দাবি করেন তিনি।
‘সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয়েছিল’
দেশে চলমান সারসংকট নিয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। এরপরও একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করেছে।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে যারা সারের ডিলার ছিলেন, তাঁদের কাউকেই সরকার বাদ দেয়নি। তাঁর অভিযোগ, এই ডিলারদের একটি অংশই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছে।
বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সারের সংকট মোকাবিলায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে নতুন সার ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ডিলার নিয়োগের মাধ্যমে সার বিতরণব্যবস্থায় আরও বিস্তৃত কাভারেজ তৈরি করা এবং কৃষকদের কাছে সার পৌঁছানো সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও জ্বালানি সরবরাহে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে বলে মতবিনিময় সভায় জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এর প্রভাব দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর পড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে বলে দাবি করেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে আগামী সপ্তাহের মধ্যে দেশের ৯ থেকে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার লক্ষ্যে অতি উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে সরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা গেলে সরবরাহ পরিস্থিতিতে উন্নতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিন বছরের বিদ্যুৎ পরিকল্পনা
দেশের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সরকার আগামী তিন বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তিনি বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কথা উল্লেখ করেন।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মাটির নিচে কয়লা ও জ্বালানি তেলের মজুত নেই। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও সীমিত। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিকল্প জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যেতে হবে।
এর অংশ হিসেবে জামালপুর ও হবিগঞ্জে অকৃষি জমিতে সৌরপ্যানেল স্থাপনের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
তাঁর আশা, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্র
মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পরিকল্পনাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্র বা ‘হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং সেন্টার’ স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এ জন্য সারা দেশে ৪২ হাজার ৩৯০ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তাঁর মতে, এসব স্বাস্থ্যকর্মী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য হলে সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য দূরের হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে না।
বিশেষ করে নারীদের বিভিন্ন রোগ দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা গেলে স্তন ক্যানসারের মতো রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ সহজ হবে এবং এ ধরনের রোগে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হবে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপের কথা
মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল দেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি, সার ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে ব্যর্থ করতে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল ও সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা শনাক্ত হওয়ার পর সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানার সভাপতিত্বে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় খাদ্যমন্ত্রী ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানম, মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবির, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম এবং জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নূরতাজ আলম বাহার বক্তব্য দেন।
সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের চলমান বিভিন্ন সংকট এবং তা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা উঠে আসে।