
তথ্যসূত্র: টাইম
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এবং এ প্রযুক্তির বিকাশ, ব্যবহার ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারকারী ১০০ ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’। বার্ষিক এই তালিকা এবার চতুর্থবারের মতো প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ‘টাইম ১০০ এআই’ তালিকায় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, গবেষক, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, শ্রমিকনেতা ও বিনোদনজগতের ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রভাবশালী মানুষ স্থান পেয়েছেন। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং এর সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা চলছে, এবারের তালিকায় তারও প্রতিফলন রয়েছে।
বিশেষ সংখ্যাটির প্রচ্ছদে এআই খাতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরেছে ‘টাইম’। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই, অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) মহাসচিব ডোরিন বোগদান-মার্টিন, মারিয়ান ক্রোক, ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন, অভিনেতা ও এআই নিয়ে কাজ করা জোসেফ গর্ডন-লেভিট, প্যারিস হিলটন, লিলা ইব্রাহিম, আইবিএমের প্রধান নির্বাহী অরবিন্দ কৃষ্ণা, এআই গবেষক ফেই-ফেই লি, থিঙ্কিং মেশিনস ল্যাবসের প্রধান নির্বাহী মিরা মুরাতি, ইলন মাস্ক, ডেভিড স্যাক্স, শ্রমিকনেতা লিজ শুলার, এআই গবেষক ইলিয়া সুতস্কেভার এবং এডি উ।
এবারের বিশেষ সংখ্যায় তালিকাভুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত এবং দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছে ‘টাইম’। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন থিঙ্কিং মেশিনস ল্যাবসের প্রধান নির্বাহী মিরা মুরাতি, আইটিইউর মহাসচিব ডোরিন বোগদান-মার্টিন এবং ওপেনএভিডেন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল নাডলার।
যেভাবে তৈরি হলো ‘টাইম ১০০ এআই’ তালিকা
‘টাইম’ জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এবারের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সাময়িকীটির সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা এআই খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং সংশ্লিষ্ট অসংখ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে মতামত ও সুপারিশ সংগ্রহ করেছেন।
এরপর বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রভাব, অবদান ও ভূমিকা বিবেচনা করে ১০০ জনকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকাটি মূলত চারটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে—লিডারস, ইনোভেটরস, শেপারস ও থিঙ্কারস।
‘লিডারস’ বিভাগে এআই খাতের নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের স্থান দেওয়া হয়েছে। ‘ইনোভেটরস’ বিভাগে রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, পণ্য ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিরা। ‘শেপারস’ বিভাগে এআইয়ের ব্যবহার, নীতিমালা ও সমাজে এর প্রভাবকে প্রভাবিত করছেন এমন ব্যক্তিদের এবং ‘থিঙ্কারস’ বিভাগে এআই নিয়ে চিন্তা, গবেষণা ও বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
‘টাইম’-এর বিবেচনায়, এ তালিকার ব্যক্তিরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এআইয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন।
মানুষের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে এআই
২০২৬ সালের তালিকা নিয়ে ‘টাইম’-এর প্রধান সম্পাদক স্যাম জ্যাকবস বলেন, তিন বছর আগে যখন সাময়িকীটি প্রথম ‘টাইম ১০০ এআই’ তালিকা প্রকাশ শুরু করে, তখন মূল লক্ষ্য ছিল এআই খাতের পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা।
জ্যাকবসের মতে, অল্প সময়ের মধ্যেই এআই মানুষের কৌতূহলের বিষয় থেকে বেরিয়ে এসে দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। মানুষের জ্ঞান অর্জন ও তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এআইয়ের ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে।
তিনি বলেন, এআই এখন আর কেবল একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি নয়; মানুষের কাজ ও জীবনযাপনের সঙ্গে এটি ক্রমেই গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে এ প্রযুক্তির উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রভাবও বাড়ছে।
‘টাইম’-এর প্রধান সম্পাদক আরও বলেন, এআই খাত এখন অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং একই সঙ্গে এটি বিতর্কেরও কেন্দ্রে রয়েছে। প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা যেমন ব্যাপক, তেমনি এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ‘টাইম ১০০ এআই’ তালিকায় এআই খাতের এই পরিবর্তনশীল, সম্ভাবনাময় ও বিতর্কিত পরিস্থিতিই প্রতিফলিত হয়েছে।
গত এক বছরে এআই খাতে বড় পরিবর্তন
এআই খাতে গত এক বছরে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেছেন স্যাম জ্যাকবস।
তাঁর উল্লেখ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইলন মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআইকে ঘিরে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ এবং শেয়ারবাজারে যাওয়ার উদ্যোগ। একই সময়ে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান দারিও আমোদেই এআইকে সামরিক ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে মতপার্থক্যে জড়িয়েছেন।
অন্যদিকে ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন এআইয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ডেটা সেন্টার অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগ করছেন। এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হওয়ায় ডেটা সেন্টার বর্তমানে এআই প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠেছে।
চীনের এআই খাতের অগ্রগতিও এবারের তালিকায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চীনা স্টার্টআপ মুনশট এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়াং ঝিলিন এমন প্রযুক্তি উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, যা কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তির সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করছে।
ফলে এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের প্রতিযোগিতাও এখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
এআই নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ‘টাইম’-এর তালিকায় এআই প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিরাও স্থান পেয়েছেন।
স্যাম জ্যাকবস বিশেষভাবে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, শ্রমিকনেতা লিজ শুলার এবং অভিনেতা জোসেফ গর্ডন-লেভিটের কথা উল্লেখ করেছেন।
এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহারে কর্মসংস্থান, শ্রমবাজার, সৃজনশীল পেশা এবং মানুষের কাজের ধরন কীভাবে বদলে যেতে পারে—এসব প্রশ্ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক চলছে। একই সঙ্গে এআইয়ের ভুল তথ্য তৈরি, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং সামরিক কাজে ব্যবহারের মতো বিষয়ও নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এ কারণে এবারের ‘টাইম ১০০ এআই’ তালিকায় শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী বা ব্যবসায়িকভাবে সফল ব্যক্তিরাই নন, বরং এআইয়ের সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরাও গুরুত্ব পেয়েছেন।
প্রযুক্তি থেকে নীতিনির্ধারণ—বিস্তৃত হচ্ছে এআইয়ের প্রভাব
এআই খাতের প্রভাব এখন প্রযুক্তি কোম্পানির গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণ, অর্থনীতি, শ্রমবাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন ও গণমাধ্যম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তালিকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইটিইউর মহাসচিব ডোরিন বোগদান-মার্টিনের মতো আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে স্যাম অল্টম্যান, দারিও আমোদেই, মিরা মুরাতি ও ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তা—সবাই এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একইভাবে গবেষক ফেই-ফেই লি ও ইলিয়া সুতস্কেভারের মতো বিজ্ঞানী এবং শ্রমিকনেতা লিজ শুলার ও বিনোদনজগতের জোসেফ গর্ডন-লেভিটের অন্তর্ভুক্তি দেখায়, এআইয়ের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়েছে।
অর্থাৎ এআই এখন কেবল নতুন সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি তৈরির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মানুষের কর্মসংস্থান, সৃজনশীলতা, তথ্যপ্রাপ্তি, ব্যবসা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থার নানা প্রশ্ন।
সান ফ্রান্সিসকোতে বিশেষ আয়োজন
‘টাইম’ জানিয়েছে, তালিকায় স্থান পাওয়া এআই খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্মান জানাতে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত হবে ‘টাইম ১০০ ইমপ্যাক্ট ডিনার’। সেখানে এআই প্রযুক্তির বর্তমান প্রভাব, এর দ্রুত পরিবর্তনশীল ভবিষ্যৎ এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হবে।
‘টাইম ১০০ এআই’ তালিকার মাধ্যমে সাময়িকীটি মূলত এআই বিপ্লবের বিভিন্ন দিককে একসঙ্গে তুলে ধরেছে। একদিকে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা রয়েছেন, অন্যদিকে রয়েছেন নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সমালোচকেরা।
এতে স্পষ্ট যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু প্রযুক্তিবিদদের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। এআই কীভাবে মানুষের জীবন ও কাজকে বদলে দেবে এবং সেই পরিবর্তন কতটা নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও নিয়ন্ত্রিত হবে—তা নির্ধারণে প্রযুক্তি খাতের বাইরের বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।